Read more
পুরুলিয়ার পলাশ বন মানেই বসন্তের এক আগুনের রূপ। যখন চারদিকে রুক্ষ তামাটে মাটি, তখন এই পলাশ ফুলই প্রকৃতিকে এক মায়াবী সাজে সাজিয়ে তোলে। পুরুলিয়া ও পলাশ যেন একে অপরের পরিপূরক।
এই পলাশ বন সম্পর্কে কিছু বিশেষ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
১. বসন্তের রঙ
পুরুলিয়ার পলাশ বনের আসল রূপ দেখা যায় ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত। এই সময় গাছের সব পাতা ঝরে গিয়ে শুধু লাল টকটকে পলাশ ফুলে ভরে ওঠে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাহাড়ের গায়ে কে যেন আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে, তাই একে 'অরণ্যের অগ্নি' (Flame of the Forest) বলা হয়।
২. সেরা দেখার জায়গা
পুরুলিয়ার প্রায় সব গ্রামেই পলাশ দেখা যায়, তবে কয়েকটি জায়গা বিশেষভাবে পরিচিত:
অযোধ্যা পাহাড়: এখানকার পাহাড়ি রাস্তার দুই ধারে মাইলের পর মাইল পলাশ বন দেখা যায়।
বাঘমুণ্ডি ও ঝালদা: এই অঞ্চলগুলো পলাশের জন্য পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
বড়ন্তি ও গড়পঞ্চকোট: জলাধারের ধারে পলাশ বনের দৃশ্য অপূর্ব লাগে।
৩. পলাশ ও সংস্কৃতি
পলাশ শুধু ফুল নয়, এটি পুরুলিয়ার আদিবাসী সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
উৎসব: দোল বা বসন্ত উৎসবের সময় পলাশ ফুল ছাড়া অসম্পূর্ণ। স্থানীয়রা এই ফুলের রঙ দিয়ে আবির তৈরি করেন।
গান ও নাচ: ঝুমুর গান এবং ছৌ নাচে পলাশ ফুলের উল্লেখ এবং ব্যবহার প্রচুর দেখা যায়।
৪. অর্থনৈতিক গুরুত্ব
পলাশ ফুল ও গাছ স্থানীয়দের জীবনজীবিকার সাথেও যুক্ত। এই ফুলের পাতা দিয়ে থালা-বাটি তৈরি হয় এবং ফুল থেকে প্রাকৃতিক রং তৈরি করা হয়। এছাড়া ভেষজ ওষুধ হিসেবেও পলাশের ব্যবহার রয়েছে।
একটি ছোট টিপস: আপনি যদি পলাশ বনের প্রকৃত আনন্দ নিতে চান, তবে ট্রেনের জানলায় চোখ রেখে আদ্রা থেকে পুরুলিয়া যাওয়ার পথটি বেছে নিতে পারেন। রাস্তার দুই ধারের লাল পলাশ আপনার যাত্রা স্মরণীয় করে রাখবে।
বসন্তের পুরুলিয়া মানেই লাল পলাশ, শিমুল আর মহুলের গন্ধে মাতোয়ারা এক মায়াবী পরিবেশ। ২ রাত ৩ দিনের একটি আদর্শ ভ্রমণ তালিকা নিচে দেওয়া হলো যা আপনাকে পলাশ বনের আসল স্বাদ পেতে সাহায্য করবে:
দিন ১: পলাশ ঘেরা বড়ন্তি ও পাহাড়ি হাতছানি
সকাল: পুরুলিয়া বা আদ্রা স্টেশনে নেমে সোজা চলে যান বড়ন্তি। এটি একটি ছোট গ্রাম যার একদিকে পাহাড় আর অন্যদিকে জলাধার।
দুপুর: জলাধারের ধারে পলাশ বনের নিচে বসে দুপুরের খাবার সারুন।
বিকেল: বড়ন্তি লেকের পাড়ে সূর্যাস্ত দেখুন। লেকের শান্ত জল আর চারপাশের লাল পলাশের প্রতিচ্ছবি এক অদ্ভুত দৃশ্য তৈরি করে।
রাত: বড়ন্তির কোনো রিসর্টে রাত্রিযাপন।
দিন ২: অযোধ্যা পাহাড়ের পথে পলাশ বিলাস
সকাল: গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন অযোধ্যা পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। পথে যেতে যেতে রাস্তার দুপাশে মাইলের পর মাইল পলাশ বন আপনাকে মুগ্ধ করবে।
দুপুর: একে একে দেখে নিন—
বামনী ফলস ও টুরগা ফলস: জলপ্রপাতের শব্দ আর বনের নিস্তব্ধতা।
আপার ড্যাম ও লোয়ার ড্যাম: পাহাড়ের ওপর বিশাল জলাধার।
বিকেল: চলে যান খয়রাবেড়া ড্যাম। এখানে পলাশ গাছের সংখ্যা অনেক বেশি। পাহাড়ের ঢালে পলাশ বনের সৌন্দর্য দেখার এটাই সেরা জায়গা।
রাত: বাঘমুণ্ডি বা অযোধ্যা পাহাড়ের ওপর কোনো গেস্ট হাউসে রাত্রিযাপন।
দিন ৩: জঙ্গল মহল ও লোকসংস্কৃতি
সকাল: ভোরে চলে যান পাখি পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা শিল্পকর্ম আর চারপাশের জঙ্গল আপনাকে অন্য জগতে নিয়ে যাবে।
দুপুর: ফেরার পথে দেখে নিন চড়িদা গ্রাম। এটি ছৌ নাচের মাস্ক তৈরির জন্য বিখ্যাত। এখান থেকে স্মারক হিসেবে মাস্ক কিনতে পারেন।
বিকেল: স্টেশন যাওয়ার আগে কোনো এক পলাশ বনের নিচে দাঁড়িয়ে মন ভরে ছবি তুলে নিন। এরপর ঝালদা বা পুরুলিয়া স্টেশন থেকে ট্রেনের উদ্দেশ্যে রওনা।
ভ্রমণের কিছু জরুরি টিপস:
পোশাক: দিনের বেলা রোদের তেজ থাকতে পারে, তাই সুতির হালকা পোশাক সাথে রাখুন। তবে ভোরে বা রাতে হালকা ঠান্ডা লাগতে পারে।
ক্যামেরা: পলাশের লাল রঙ ক্যামেরায় বন্দি করার জন্য মেমোরি কার্ড খালি করে আনুন!
বুকিং: বসন্তকালে পর্যটকদের ভিড় থাকে, তাই গাড়ি এবং হোটেল আগে থেকে বুক করে রাখা ভালো।

0 Reviews