Read more
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিভা : নিশীথে (এক বিদেহী অতৃপ্ত আত্মার আকুতি)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নিশীথে’ ছোটগল্পটি বাংলা সাহিত্যে অলৌকিক ও মনস্তাত্ত্বিক গল্পের এক অনন্য নিদর্শন। এই গল্পে অতৃপ্ত আত্মার যে করুণ আকুতি ফুটে উঠেছে, তা কেবল ভয়ংকর নয়, বরং এক গভীর বেদনাবোধের বহিঃপ্রকাশ।
গল্পটির মূল ভাব ও ছোটগল্পকার হিসেবে রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার কিছু দিক নিচে আলোচনা করা হলো:
১. অলৌকিকতা ও বাস্তবতার সমন্বয়
রবীন্দ্রনাথ অলৌকিকতাকে কেবল ভয়ের আবহে সীমাবদ্ধ রাখেননি। ‘নিশীথে’ গল্পে জমিদার দক্ষিণাচরণ ও তার মৃত স্ত্রীর সম্পর্কের টানাপোড়েনকে তিনি অতিপ্রাকৃত স্তরে নিয়ে গেছেন। মৃত স্ত্রীর সেই অশরীরী প্রশ্ন— “ও কে? ও কে গো?”—কেবল একটি ভৌতিক ডাক নয়, বরং তা অপরাধবোধে দগ্ধ একজন মানুষের বিবেকের দংশন।
২. মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ
গল্পটি পড়ার সময় মনে হয়, এটি কি আসলেও কোনো প্রেতাত্মার উপস্থিতি, নাকি দক্ষিণাচরণের অবদমিত অপরাধবোধের মানসিক বিকার? রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত নিপুণভাবে দেখিয়েছেন যে, মানুষ যখন তার নৈতিকতা বা প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে, তখন তার নিজের মনই তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। মৃত স্ত্রীর অতৃপ্ত আত্মা এখানে দক্ষিণাচরণের ভেতরের ‘বিবেক’ হিসেবে কাজ করেছে।
৩. অতৃপ্ত আত্মার চিরন্তন আকুতি
গল্পের শেষে দেখা যায়, দক্ষিণাচরণ যখন তার দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সুখে থাকার চেষ্টা করছে, তখনই সেই নিশীথ রাতে অতৃপ্ত আত্মাটি ফিরে আসে। এই ‘বিদেহী আত্মা’ আসলে সেই হারানো বিশ্বাস ও ভালোবাসার প্রতীক যা দক্ষিণাচরণ রক্ষা করতে পারেনি। কবির ভাষায় সেই কণ্ঠস্বরের করুণ সুর পাঠককে এক রহস্যময় বিষণ্ণতায় ডুবিয়ে দেয়।
৪. পরিবেশ সৃষ্টিতে মুন্সিয়ানা
গল্পের নামকরণের মধ্যেই এক গভীর রহস্যময়তা রয়েছে। ‘নিশীথে’ বা গভীর রাতের নিস্তব্ধতাকে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে ব্যবহার করেছেন, তাতে অলৌকিক পরিবেশটি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। নদীর ধারের নির্জন কুঠিবাড়ি, অন্ধকার রাত আর বাতাসের দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দগুলো গল্পের থমথমে ভাবকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
উপসংহার:
‘নিশীথে’ গল্পে রবীন্দ্রনাথ প্রমাণ করেছেন যে, আত্মা বা ভূত কেবল বাইরের কোনো শক্তি নয়; মানুষের হৃদয়ের অপ্রকাশিত বেদনা, ঈর্ষা আর অপরাধবোধই অনেক সময় অশরীরী রূপ নিয়ে ফিরে আসে। এক বিদেহী আত্মার আর্তনাদ এখানে আসলে মানব হৃদয়েরই এক চিরন্তন হাহাকার।
রবীন্দ্রনাথের ‘নিশীথে’ গল্পের দক্ষিণাচরণ চরিত্রটি অত্যন্ত জটিল এবং দ্বান্দ্বিক। তার চরিত্রের কিছু বিশেষ দিক নিয়ে আমরা আলোচনা করতে পারি:
১. প্রতিজ্ঞা ও বিশ্বাসভঙ্গ
দক্ষিণাচরণের চরিত্রের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো তার নিজের কাছে নিজে করা প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে না পারা। তার প্রথম স্ত্রী যখন মুমূর্ষু অবস্থায় ছিল, তখন সে বলেছিল যে অন্য কাউকে তার জায়গায় বসাবে না। কিন্তু সেই ভালোবাসার আবেগের চেয়ে জৈবিক আকাঙ্ক্ষা বা একাকীত্ব বড় হয়ে ওঠায় সে দ্বিতীয়বার বিবাহ করে। এই 'প্রতিজ্ঞাভঙ্গ' তার অবচেতনে এক গভীর অপরাধবোধ (Guilt) তৈরি করে।
২. অবচেতন মনের দ্বন্দ্বে দক্ষিণাচরণ
অনেকে মনে করেন, গল্পে যে অশরীরী কণ্ঠ শোনা যায়, তা আসলে দক্ষিণাচরণের নিজেরই মনের বিকল অবস্থা। তার দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার মুহূর্তে যখনই তার মনে পড়ে যায় সেই ফেলে আসা অতীত, তখনই সে শুনতে পায়— "ও কে? ও কে গো?"। দক্ষিণাচরণ আসলে তার বর্তমান সুখ আর অতীতের স্মৃতির মাঝখানে পিষ্ট হওয়া একটি চরিত্র।
৩. পলায়নপর মানসিকতা
দক্ষিণাচরণ যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং অদ্ভুত সব কাণ্ড শুরু করে, তখন সে চিকিৎসকের কাছে যায় এবং সেখান থেকে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ভৌগোলিক দূরত্ব অতিক্রম করলেও সে নিজের মন থেকে পালাতে পারে না। এই যে নিজের বিবেকের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ানো—এটিই রবীন্দ্রনাথ তাকে দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন।
Ø @আব্দুল মুসরেফ খাঁন @কনকপুর 🌐@পাঁশকুড়া।।
Ø 📌 সাবস্ক্রাইব করুন:
https://www.youtube.com/@bengalibabu2026
Ø 📌 ফেসবুক পেজ: https://www.facebook.com/share/1BBtH1yCDF/
Ø 📌 ইনস্টাগ্রাম:
https://www.instagram.com/author_librarystudy?igsh=MTRoZTYwZ2szcTh0bg==

0 Reviews