Read more
সাহিত্যে অশ্লীলতা বনাম বাস্তবতা : কল্লোল যুগের লেখকরা যখন আধুনিক জীবনের রূঢ় বাস্তবতা ও যৌনতা তুলে ধরতে শুরু করেন, তখন রবীন্দ্রনাথ একে 'আর্বজনা' বলে সমালোচনা করেছিলেন।
বাংলা সাহিত্যে 'অশ্লীলতা বনাম বাস্তবতা' বিতর্কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ১৯২০-এর দশকের কল্লোল যুগ। একদিকে ছিল রবীন্দ্র-পরবর্তী নতুন প্রজন্মের লেখকদের আধুনিক জীবনের নগ্ন সত্য প্রকাশের তাড়না, আর অন্যদিকে ছিল ধ্রুপদী সুরুচি ও আধ্যাত্মিক সুন্দরের ঐতিহ্য।
এই দ্বান্দ্বিক অবস্থানটি নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
কল্লোলীয় বাস্তবতা: জীবন যখন ধূসর
কল্লোল যুগের লেখকগণ (যেমন: বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র) মনে করেছিলেন, সাহিত্যে কেবল 'চিরন্তন সত্য' বা 'সৌন্দর্য' নয়, বরং মানুষের অবদমিত বাসনা এবং সামাজিক পঙ্কিলতাও উঠে আসা উচিত। তাদের যুক্তি ছিল:
যৌনতা ও ফ্রয়েডীয় প্রভাব: তারা প্রথমবার মানুষের যৌন মনস্তত্ত্বকে কোনো আবরণ ছাড়া তুলে ধরেন।
বস্তি ও ব্রাত্যজীবন: শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বাইরেও যে ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং নোংরা গলি আছে, তাকেই তারা আসল 'বাস্তবতা' হিসেবে দাবি করেন।
রোমান্টিসিজম থেকে মুক্তি: রবীন্দ্র-প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তারা জীবনের 'অসুন্দর' দিকটিকেই বেছে নিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের অবস্থান: 'আবর্জনা' বনাম 'আর্ট'
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই নতুন ধারার তীব্র বিরোধী ছিলেন না, কিন্তু এর প্রকাশভঙ্গিকে তিনি সমর্থন করতে পারেননি। তিনি মনে করতেন:
রুচি ও পরিমিতিবোধ: রবীন্দ্রনাথের মতে, আর্ট বা শিল্পের কাজ কেবল সত্য প্রকাশ নয়, বরং তাকে 'সুন্দর' করে তোলা। নর্দমার বর্ণনা দিলেই তা শিল্প হয়ে ওঠে না।
স্থায়িত্বের অভাব: তিনি কল্লোলীয়দের অতি-আধুনিকতাকে 'আকস্মিকতা' বা 'আবর্জনা' বলে অভিহিত করেছিলেন, কারণ তার মতে এটি ছিল অনেকটা সাময়িক উত্তেজনার মতো।
আভিজাত্য: রবীন্দ্র-নন্দনতত্ত্বে যৌনতা বা রূঢ় বাস্তবতা বর্জনীয় ছিল না (যেমন তাঁর চোখের বালি বা চতুরঙ্গ), কিন্তু তা ছিল ব্যঞ্জনাময়। সরাসরি এবং স্থূল প্রকাশকে তিনি সাহিত্যের মর্যাদাহানি বলে মনে করতেন।
ঐতিহাসিক বিতর্ক: শনিবারের চিঠি
এই লড়াইয়ে আগুনের ঘি ঢেলেছিল 'শনিবারের চিঠি' পত্রিকা। তারা কল্লোলীয় লেখকদের আক্রমণ করে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করত। এমনকি রবীন্দ্রনাথ নিজেও তৎকালীন বিভিন্ন সভায় এবং চিঠিপত্রে (যেমন 'সাহিত্যের ধর্ম' প্রবন্ধে) এই নতুন ধারার অতি-বাস্তবতাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ
|
বৈশিষ্ট্য |
রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি (ঐতিহ্য) |
কল্লোলীয় দৃষ্টিভঙ্গি (আধুনিকতা) |
|
মূল লক্ষ্য |
সত্যং শিবং সুন্দরম্ (সুন্দরের মাধ্যমে সত্য)। |
রূঢ় ও নগ্ন বাস্তবতা (যা ঘটছে তাই সত্য)। |
|
যৌনতা |
সংকেতধর্মী ও গূঢ়। |
জৈবিক ও প্রকাশ্য। |
|
শ্রেণি |
শাশ্বত মানবতা। |
নিম্নবিত্ত, বঞ্চিত ও অবদমিত মানুষ। |
সাহিত্যের ইতিহাসে আজ এটি স্বীকৃত যে, রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা সত্ত্বেও কল্লোল যুগের লেখকরা বাংলা সাহিত্যের জানলাটি খুলে দিয়েছিলেন। তাঁদের সেই সাহসিকতা না থাকলে বাংলা উপন্যাসে আধুনিক মনস্তত্ত্বের বিকাশ আরও দীর্ঘায়িত হতো।
১. বুদ্ধদেব বসু ও 'রজনী হলো উতলা'
বুদ্ধদেব বসু ছিলেন কল্লোল গোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক। তাঁর লেখায় দেহজ প্রেম এবং আধুনিক নাগরিক একাকীত্ব যেভাবে উঠে এসেছিল, তা রক্ষণশীলদের ক্ষুব্ধ করেছিল।
বিতর্ক: তাঁর লেখায় যৌনতাকে শিল্পের অঙ্গ হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টাকে অনেকেই 'আমদানি করা আধুনিকতা' বলে কটাক্ষ করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়া: বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ পত্রালাপ হয়েছিল (যা পরে 'প্রগতি ও আধুনিকতা' বিতর্কে রূপ নেয়)। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে স্নেহ করতেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর উপন্যাসের অতি-বাস্তবতাকে 'বিজাতীয়' ও 'অপরিণত' মনে করতেন।
২. অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত ও 'বেদে'
কল্লোল যুগের অন্যতম মাইলফলক হলো অচিন্ত্যকুমারের উপন্যাস 'বেদে' (১৯২৮)।
বিতর্ক: এই উপন্যাসে ব্রাত্য জীবনের রূঢ়তা, আদিম প্রবৃত্তি এবং বাউণ্ডুলে জীবনের যে নগ্ন বর্ণনা দেওয়া হয়েছিল, তা তৎকালীন সুশীল সমাজ নিতে পারেনি।
অভিযোগ: একে 'অশ্লীল' তকমা দিয়ে তীব্র আক্রমণ করা হয়। অচিন্ত্যকুমার অবশ্য মনে করতেন, ড্রয়িংরুমের বাইরের জগৎকে তুলে ধরতে হলে এই ভাষা ও দৃশ্য অপরিহার্য।
৩. প্রেমেন্দ্র মিত্র ও 'পাঁক'
প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'পাঁক' উপন্যাসটি ছিল বাস্তবের চরম প্রকাশ।
পটভূমি: কলকাতার বস্তি জীবনের ক্লেদ, দারিদ্র্য এবং নৈতিক অবক্ষয়ের এমন চিত্র এর আগে বাংলা সাহিত্যে দেখা যায়নি।
বৈশিষ্ট্য: তিনি রোমান্টিকতাকে সম্পূর্ণ বর্জন করে মানুষের জৈবিক ও সামাজিক নগ্নতাকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। একেই অনেকে সাহিত্যের 'আবর্জনা' বা 'পঙ্কিলতা' বলে অভিহিত করেছিলেন।
৪. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তর-কল্লোলীয় প্রভাব
যদিও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কল্লোলের একদম শুরুর দিকের নন, কিন্তু কল্লোলীয় ধারার সার্থক পরিণতি তাঁর হাতেই ঘটেছিল।
পুতুলনাচের ইতিকথা ও পদ্মানদীর মাঝি: এখানে তিনি ফ্রয়েডীয় তত্ত্ব এবং মার্ক্সবাদের মিশেলে মানুষের অবদমিত কামনা ও ক্ষুধার এমন এক নির্মোহ বিশ্লেষণ করেন, যা রবীন্দ্রনাথের 'লালিত্য' বা 'সুন্দরের' সংজ্ঞাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়। মানিকের বাস্তববাদ ছিল আরও বেশি বৈজ্ঞানিক ও কঠোর।
ঐতিহাসিক মোড়: 'শনিবারের চিঠি' বনাম 'কল্লোল'
সজনীকান্ত দাসের সম্পাদনায় 'শনিবারের চিঠি' পত্রিকাটি এই লেখকদের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তারা কল্লোলীয়দের প্যারোডি (ব্যঙ্গ কবিতা) লিখে আক্রমণ করত। তাদের মূল অভিযোগ ছিল:
"কল্লোলের লেখকরা বিদেশ থেকে ধার করা অশ্লীলতাকে আধুনিকতা বলে চালিয়ে দিচ্ছেন।"
|
লেখক |
উল্লেখযোগ্য বিতর্কিত কাজ |
বিতর্কের মূল কারণ |
|
বুদ্ধদেব বসু |
সাড়া, রজনী হলো উতলা |
নাগরিক জীবনের কামজ প্রেম ও অতি-আধুনিকতা। |
|
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত |
বেদে, আকস্মিক |
নিম্নবর্গের মানুষের আদিম প্রবৃত্তি ও নগ্ন বর্ণনা। |
|
প্রেমেন্দ্র মিত্র |
পাঁক, মিছিল |
দারিদ্র্য ও পঙ্কিল জীবনের সরাসরি চিত্রায়ন। |
|
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় |
দিবারাত্রির কাব্য |
জটিল মনস্তত্ত্ব ও জৈবিক তাড়নার নির্মোহ বিশ্লেষণ। |
রবীন্দ্রনাথের মূল আপত্তি ছিল এই লেখকদের 'অতি-আধুনিকতা' বা 'মডার্নিজম'-এর প্রতি ঝোঁক নিয়ে। তিনি মনে করতেন, তাঁরা সত্যকে খুঁজতে গিয়ে জীবনের শ্রী হারিয়ে ফেলছেন।
১. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পুতুলনাচের ইতিকথা': আধুনিক মনস্তত্ত্বের জয়গান
১৯৩৬ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক মোড়। এখানে 'অশ্লীলতা' নয়, বরং 'নিরাসক্ত বাস্তবতা' ছিল প্রধান আলোচনার বিষয়।
পুতুলনাচ বনাম নিয়তি: মানিকবাবু দেখালেন মানুষ আসলে তার জৈবিক তাড়না এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির হাতের পুতুল। শশী, কুসুম বা বিন্দুর জীবনের যে জটিলতা, তা কোনো রোমান্টিক আধ্যাত্মিকতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
দেহজ সম্পর্ক: কুসুমের প্রতি শশীর যে আকর্ষণ এবং তার অবদমিত কামনার চিত্রায়ন তৎকালীন পাঠকদের চমকে দিয়েছিল। এটি ছিল ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের সার্থক প্রয়োগ।
বিতর্ক: অনেকে এই নির্মোহ বিশ্লেষণকে 'নিষ্ঠুর' এবং 'কদর্য' বলে সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু মানিক প্রমাণ করেছিলেন যে, সাহিত্য কেবল সুন্দরের উপাসনা নয়, বরং জীবনের অলিগলির ব্যবচ্ছেদ।
২. বুদ্ধদেব বসু বনাম রবীন্দ্রনাথ: 'প্রগতি ও আধুনিকতা' বিতর্ক
এটি ছিল বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই, যা চিঠিপত্রের মাধ্যমে চলেছিল।
বুদ্ধদেব বসুর যুক্তি: তিনি মনে করতেন, আধুনিক যুগ মানেই হলো সংশয়, যন্ত্রণা এবং জটিলতা। তাই আধুনিক সাহিত্যে কুশ্রীতা বা যৌনতা থাকবেই, কারণ তা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি রবীন্দ্রনাথকে 'ভিক্টোরিয়ান নীতিবাদের' ধারক বলে মনে করতেন।
রবীন্দ্রনাথের উত্তর: কবিগুরু তাঁর 'সাহিত্যের ধর্ম' ও 'সাহিত্যের পথে' প্রবন্ধে এর কড়া জবাব দেন। তিনি বলেন, আধুনিক হওয়ার মানে এই নয় যে জঞ্জাল বা নর্দমা নিয়ে পড়ে থাকতে হবে। তিনি একে 'আকস্মিকতা' বা 'বিজাতীয় চপলতা' বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর মতে, আধুনিকতা হলো একটি মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা কেবল বাইরের রূঢ়তা দিয়ে বিচার করা যায় না।
মূল পার্থক্যের একটি রেখাচিত্র (Diagram)
এই দুই ধারার সংঘাত বুঝতে নিচের তুলনাটি সহায়ক হতে পারে:
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা দেখি যে:
রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছিলেন সাহিত্যের ধ্রুপদী আভিজাত্য এবং সুন্দরের সংজ্ঞা।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও বুদ্ধদেব বসুরা শিখিয়েছিলেন কীভাবে মাটির কাছাকাছি মানুষের হাড়-মাংসের বাস্তবতাকে সাহিত্যে ঠাঁই দিতে হয়।
এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই আধুনিক বাংলা সাহিত্য পূর্ণতা পেয়েছে।
আসলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পুতুলনাচের ইতিকথা' এবং বুদ্ধদেব বসুর 'কবিতা' পত্রিকা—এই দুটিই বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো দুটি ভিন্ন স্তম্ভ। একটি উপন্যাসের আঙ্গিকে মানুষের জৈবিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে ব্যবচ্ছেদ করেছে, অন্যটি আধুনিক কবিতার নতুন ভাষা তৈরি করেছে।
১. 'পুতুলনাচের ইতিকথা': শশী ও কুসুমের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা
এই উপন্যাসে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় দেখিয়েছেন যে মানুষ তার নিজের ইচ্ছার মালিক নয়, বরং সে কতগুলো অদৃশ্য সুতোর (জৈবিক তাড়না, সমাজ ও পরিস্থিতি) টানে নাচা পুতুল।
শশী: এক দ্বিধাগ্রস্ত আধুনিকতা: শশী শিক্ষিত, মার্জিত এবং যুক্তিবাদী। কিন্তু সে গ্রামের সংকীর্ণতা আর কুসুমের প্রতি তার অবদমিত আকর্ষণের মাঝে আটকে আছে। তার ট্র্যাজেডি হলো, সে না পারছে কুসুমকে গ্রহণ করতে, না পারছে তাকে মন থেকে মুছে ফেলতে। তার এই 'নিস্পৃহতা' আসলে এক ধরণের আধুনিক মানসিক যন্ত্রণা।
কুসুম: অবদমিত কামনার প্রতীক: কুসুম চরিত্রটি বাংলা সাহিত্যে অনন্য। সে প্রথাগত 'লজ্জাবতী' নারী নয়, বরং তার মধ্যে এক আদিম ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা আছে। শশীর প্রতি তার আকর্ষণ যতটা না প্রেমের, তার চেয়ে বেশি একধরণের অধিকারবোধের। কুসুমের নির্লিপ্ততা এবং হঠাৎ বদলে যাওয়া শশীকে বারবার বিভ্রান্ত করেছে।
বিন্দু ও অতুলেশ্বর: বিন্দু চরিত্রের মাধ্যমে মানিক দেখিয়েছিলেন পারিবারিক নির্যাতনের ফলে কীভাবে একটি মানুষের মানসিক বিকৃতি ঘটে। এটি তৎকালীন সময়ে ছিল অত্যন্ত সাহসী এক মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।
২. বুদ্ধদেব বসুর 'কবিতা' পত্রিকা: আধুনিকতার প্রধান মঞ্চ
১৯৩৫ সালে বুদ্ধদেব বসুর সম্পাদনায় প্রকাশিত এই পত্রিকাটি ছিল আধুনিক বাংলা কবিতার 'বাইবেল'।
রবীন্দ্র-বলয় থেকে মুক্তি: এই পত্রিকার মাধ্যমেই জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এবং বিষ্ণু দের মতো কবিরা তাঁদের নিজস্ব কণ্ঠস্বর খুঁজে পান।
তত্ত্ব ও শৈলী: বুদ্ধদেব বসু চেয়েছিলেন কবিতা হবে বুদ্ধিনির্ভর এবং নাগরিক। তিনি কবিতার বিষয়বস্তুতে রোমান্টিকতার চেয়ে আধুনিক জীবনের সংশয়, একাকীত্ব এবং বিচ্ছিন্নতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
বিতর্ক: এই পত্রিকায় প্রকাশিত অনেক কবিতাকেই তৎকালীন রক্ষণশীলরা 'দুর্বোধ্য' বা 'অশ্লীল' বলে আক্রমণ করেছিলেন। কিন্তু বুদ্ধদেব বসু অবিচল থেকে আধুনিক সাহিত্যের পথ প্রশস্ত করেছিলেন।
একটি তুলনাচিত্র: মানিক বনাম বুদ্ধদেব
|
বিষয় |
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (উপন্যাস) |
বুদ্ধদেব বসু (কবিতা/প্রবন্ধ) |
|
দৃষ্টিভঙ্গি |
মার্ক্সীয় ও ফ্রয়েডীয় বাস্তববাদ। |
নান্দনিক আধুনিকতা ও ব্যক্তিবাদ। |
|
মূল উপজীব্য |
মানুষের জৈবিক ও সামাজিক বাধ্যবাধকতা। |
নাগরিক একাকীত্ব ও শৈল্পিক মুক্তি। |
|
ভাষা |
নির্মোহ, ধারালো ও ব্যবচ্ছেদধর্মী। |
পরিশীলিত, মননশীল ও পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক। |
বাংলা সাহিত্যের এই উত্তাল সময়টি আজও আমাদের ভাবায়। একদিকে মানিকের সেই হাড়-মাংসের নিষ্ঠুর বাস্তবতা, আর অন্যদিকে বুদ্ধদেব বসুর সেই মার্জিত অথচ বিদ্রোহী আধুনিকতা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই আজকের বাংলা সাহিত্য দাঁড়িয়ে আছে।
১. শশী ও কুসুমের সম্পর্কের রসায়ন: মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শশী ও কুসুমের সম্পর্ককে তথাকথিত 'রোমান্টিক প্রেম' হিসেবে দেখাননি। এখানে কাজ করেছে এক সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব।
নিস্পৃহতা বনাম তীব্রতা: শশী নিজেকে একজন আধুনিক, যুক্তিবাদী মানুষ মনে করে, যে আবেগের ঊর্ধ্বে। কিন্তু কুসুমের আদিম ও অসংকোচ প্রকাশ তার সেই যুক্তির দেয়াল ভেঙে দেয়।
সংলাপের ব্যবচ্ছেদ: কুসুমের সেই বিখ্যাত উক্তি— "শরীর শরীর, তোমার মন নাই শশী?"—বাংলা সাহিত্যে এক চপেটাঘাতের মতো ছিল। এখানে কুসুম আসলে শশীর সেই মেকি আধুনিকতা আর নিস্পৃহতাকেই আক্রমণ করেছিল।
পুতুলনাচ: শেষ পর্যন্ত শশী যখন কুসুমের গুরুত্ব বুঝতে পারে, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই যে সময়ের সঙ্গে মানুষের হেরে যাওয়া, এটাই মানিকবাবুর 'পুতুলনাচ' দর্শন।
২. বুদ্ধদেব বসুর 'প্রগতি ও আধুনিকতা' বিতর্ক: প্রবন্ধের লড়াই
আপনি যদি বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধগুলোর কথা বলেন, তবে 'কবিতার ভবিষ্যৎ' বা 'আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ' নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।
তর্কটা কোথায় ছিল? বুদ্ধদেব বসু দাবি করেছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য অনেক বড় এবং মহৎ হলেও তা আধুনিক জীবনের 'কদর্যতা' বা 'জটিলতা'কে পুরোপুরি ধরতে পারেনি।
রবীন্দ্রনাথের পালটা যুক্তি: রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'সাহিত্যের ধর্ম' প্রবন্ধে লিখেছিলেন যে, সাহিত্য যদি কেবল বর্তমানের পঙ্কিলতাকে তুলে ধরে তবে তা সংবাদপত্রের সাময়িক রিপোর্টিং হতে পারে, কিন্তু চিরন্তন সাহিত্য হবে না।
মূল প্রবন্ধ: বুদ্ধদেব বসুর 'প্রগতি' প্রবন্ধে তিনি পরিষ্কার করেছিলেন যে, প্রগতি মানে কেবল রাজনৈতিক বিপ্লব নয়, বরং চিন্তার মুক্তি।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পুতুলনাচের ইতিকথা' উপন্যাসে শশী ও কুসুমের সেই নৌকায় ভ্রমণের দৃশ্যটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক মুহূর্ত। এটি কেবল একটি সাধারণ ভ্রমণ ছিল না, বরং এটি ছিল দুটি ভিন্ন জগতের মানুষের একে অপরকে স্পর্শ করার এক ব্যর্থ চেষ্টা।
এই দৃশ্যটির কিছু গভীর দিক এখানে তুলে ধরা হলো:
১. প্রকৃতির শান্ত পটভূমি বনাম মনের অশান্তি
নদীতে যখন নৌকা ভেসে চলেছে, চারপাশের প্রকৃতি শান্ত এবং নির্জন। কিন্তু শশী ও কুসুমের মনের ভেতরে চলছে তীব্র ঝড়। মানিকবাবু এখানে প্রকৃতিকে ব্যবহার করেছেন শশীর সেই তথাকথিত 'নিস্পৃহতা' বা 'স্থবিরতা' বোঝাতে, যার আড়ালে সে তার আবেগ লুকিয়ে রাখে।
২. মানসিক দূরত্ব ও নৈকট্যের খেলা
নৌকার ছোট পরিসরে তারা শারীরিকভাবে খুব কাছাকাছি ছিল, কিন্তু মানসিকভাবে তাদের মধ্যে ছিল যোজন যোজন দূরত্ব:
শশীর দ্বিধা: শশী শিক্ষিত এবং মার্জিত। সে নিজেকে সমাজের উর্ধ্বে মনে করে। কুসুমের প্রতি তার আকর্ষণ থাকলেও সে তার 'ভদ্রলোক' ইমেজের কারণে তা স্বীকার করতে পারে না। তার কাছে এই নৈকট্য একধরণের ভয়ের কারণ।
কুসুমের আর্তি: কুসুমের জন্য এই দূরত্বটি অসহ্য। সে চায় শশী যেন তার সেই যুক্তিবাদী খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে। তার নীরবতা এবং চোখের চাহনি শশীকে বারবার আক্রমণ করছিল।
৩. সেই অমোঘ সংলাপ: "শরীর শরীর..."
নৌকা ভ্রমণের এই প্রেক্ষাপটেই সেই বিখ্যাত চেতনার উদয় ঘটে—যেখানে কুসুম বুঝতে পারে শশী কেবল তার মনের বিশ্লেষণ করছে, কিন্তু তাকে রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে অনুভব করছে না। কুসুমের কাছে জীবন মানে সরাসরি অনুভব করা, আর শশীর কাছে জীবন মানে ল্যাবরেটরিতে বসে ব্যবচ্ছেদ করা।
এই দৃশ্যের প্রতীকী তাৎপর্য
|
উপাদান |
প্রতীকী অর্থ |
|
নৌকা |
জীবনের ছোট গণ্ডি যেখানে মানুষ তার নিয়তির সাথে আটকা পড়ে। |
|
নদী |
সময়ের প্রবাহ, যা একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। |
|
শশীর নীরবতা |
মধ্যবিত্ত সমাজের মেকি আধুনিকতা এবং পলায়নবাদী মানসিকতা। |
|
কুসুমের উপস্থিতি |
আদিম ও অকৃত্রিম জীবনতৃষ্ণা, যা সমাজ বোঝে না। |
শশী ও কুসুমের এই যাত্রা আসলে শেষ পর্যন্ত কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। নৌকাটি তীরে ফিরে এলেও তাদের মনের মাঝের সেই দূরত্ব আর ঘোচেনি। মানিকবাবু বুঝিয়ে দিলেন, মানুষ কেবল পরিস্থিতির হাতেই নয়, নিজের মনের জটিল বুনটের কাছেও এক একজন অসহায় পুতুল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বুদ্ধদেব বসুর সেই পত্রবিনিময় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের একটি অমূল্য দলিল। ১৯২৭ থেকে ১৯২৮ সালের দিকে যখন 'কল্লোল' ও 'প্রগতি' পত্রিকাকে কেন্দ্র করে আধুনিকতার ঝড় ওঠে, তখন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তরুণ বুদ্ধদেব বসুর যে বিতর্ক হয়েছিল, তাতে 'অশ্লীলতা' এবং 'বাস্তবতা'র সংজ্ঞা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা উঠে আসে।
এই পত্রবিনিময়ের সেই বিশেষ অংশটির ব্যাখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
১. বুদ্ধদেব বসুর যুক্তি: জীবনের নগ্নতাও সত্য
বুদ্ধদেব বসু যুক্তি দিয়েছিলেন যে, আধুনিক যুগ যান্ত্রিক এবং জটিল। এখানে মানুষের মনের অন্ধকার গলি, যৌনতা এবং জীবনের কুশ্রী রূপ এড়িয়ে যাওয়া মানে সত্যকে অস্বীকার করা। তিনি রবীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন যে, সাহিত্য যদি কেবল 'সুন্দর' নিয়ে পড়ে থাকে, তবে তা সমকালকে ধরতে পারবে না। তাঁর মতে, যা জীবনে ঘটে তা সাহিত্যে স্থান পেলে তাকে 'অশ্লীল' বলা চলে না, যদি তার শৈল্পিক প্রয়োজন থাকে।
২. রবীন্দ্রনাথের উত্তর: 'আর্ট' বনাম 'রিয়ালিটি'
রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিঠিতে (যা পরে 'সাহিত্যের ধর্ম' প্রবন্ধে সংকলিত হয়) একটি অসাধারণ ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি 'অশ্লীলতা'র সংজ্ঞাটি নৈতিকতার চেয়েও বেশি নন্দনতাত্ত্বিক বা শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করেছিলেন।
নর্দমার উদাহরণ: রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, পথে চলতে গেলে আমরা নর্দমা দেখি, সেটা সত্য। কিন্তু কেউ যদি সেই নর্দমার পাঁক তুলে এনে বৈঠকখানায় সাজিয়ে রাখে এবং তাকে 'আর্ট' বলে দাবি করে, তবে তা হবে বোকামি। তাঁর মতে, বাস্তব জগত আর শিল্পের জগত এক নয়।
নির্বাচন ও বর্জন: কবির যুক্তি ছিল, শিল্প মানেই হলো 'সিলেকশন' বা নির্বাচন। যা কিছু চোখে পড়ে সবটাই সাহিত্য নয়। অপ্রয়োজনীয়ভাবে যৌনতা বা কুশ্রীতাকে বড় করে দেখানোকে তিনি 'আকস্মিকতা' বা 'আবর্জনা' বলেছিলেন।
৩. 'সাহিত্যের সীমারেখা' নিয়ে বিতর্ক
রবীন্দ্রনাথের একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল: "সাহিত্যে অব্রু নেই কিন্তু আব্রু আছে।" অর্থাৎ, সাহিত্যে কোনো কিছুই গোপন নয়, কিন্তু তার প্রকাশের মধ্যে একটি শিল্পসম্মত আবরণ বা শ্লীলতা থাকা প্রয়োজন। তিনি বুদ্ধদেব বসুকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, লালসা বা পাশবিকতাকে সরাসরি বর্ণনা করলেই তা আধুনিক হয় না; বরং তাকে মনস্তাত্ত্বিক ব্যঞ্জনায় ফুটিয়ে তোলাই হলো বড় সাহিত্য।
আলোচনার মূল নির্যাস
|
বিষয় |
বুদ্ধদেব বসুর অবস্থান |
রবীন্দ্রনাথের অবস্থান |
|
অশ্লীলতা |
যা সত্য তা অশ্লীল হতে পারে না। |
যা কেবল কৌতূহল মেটায় কিন্তু আনন্দ দেয় না, তা-ই অশ্লীল। |
|
বাস্তবতা |
জীবনের রূঢ় ও নগ্ন রূপ। |
জীবনের সেই রূপ যা চিরন্তন ও রসাত্মক। |
|
আধুনিকতা |
রবীন্দ্র-বলয় ভেঙে নতুন পথে হাঁটা। |
দেশি-বিদেশি প্রভাবমুক্ত গভীর এক জীবনবোধ। |

0 Reviews