পাঁশকুড়ায় ভবতারিণী মন্দির

পাঁশকুড়ায় ভবতারিণী মন্দির

Size

Read more





 পাঁশকুড়ায় ভবতারিণী মন্দির 

পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পাঁশকুড়ায় অবস্থিত ভবতারিণী মন্দির এই অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন এবং জাগ্রত দেবস্থান হিসেবে পরিচিত কংসাবতী নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে বহু ইতিহাস জনশ্রুতি জড়িয়ে রয়েছে

নীচে পাঁশকুড়া ভবতারিণী মন্দিরের ইতিহাসের প্রধান দিকগুলি তুলে ধরা হলো:

. প্রতিষ্ঠা প্রেক্ষাপট

পাঁশকুড়ার এই মন্দিরটি মূলত দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ির আদলে তৈরি জনশ্রুতি অনুযায়ী, কয়েক দশক আগে স্থানীয় জমিদার বা ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় মা কালীর 'ভবতারিণী' রূপ অর্থাৎ যিনি সংসার সাগর থেকে মুক্তি দেনসেই রূপেই এখানে পূজা করা হয়

. স্থাপত্য শৈলী

মন্দিরটি বাংলার ঐতিহ্যবাহী নবরত্ন স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত (যদিও বর্তমানে আধুনিক সংস্কারের ফলে এর চেহারায় কিছু পরিবর্তন এসেছে) মূল মন্দিরের গর্ভগৃহে কষ্টিপাথরের তৈরি মা ভবতারিণী এবং তাঁর পদতলে শায়িত মহাদেবের মূর্তি অত্যন্ত জীবন্ত কারুকার্যমন্ডিত

. ধর্মীয় সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

পাঁশকুড়া পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষের কাছে এই মন্দিরটি অত্যন্ত পবিত্র

পূজা অর্চনা: এখানে নিত্যপূজার পাশাপাশি প্রতি বছর কার্তিক মাসের অমাবস্যায় বিশেষ আড়ম্বরের সাথে দীপান্বিতা কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়

উৎসব: রথযাত্রা এবং মকর সংক্রান্তির সময় মন্দিরের পাদদেশে বড় মেলা বসে, যা স্থানীয় সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ

. ভৌগোলিক মাহাত্ম্য

কংসাবতী নদীর (Kasai River) পাড়ে অবস্থিত হওয়ায় মন্দিরের পরিবেশ অত্যন্ত শান্ত মনোরম একসময় এই নদীপথেই বাণিজ্য চলত এবং নাবিকরা যাত্রার শুরুতে মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে যেতেন বলে শোনা যায়


বিশেষ দ্রষ্টব্য: স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, এই মন্দিরের শান্তি আধ্যাত্মিক পরিবেশের কারণে বহু সাধক এখানে এসে সিদ্ধিলাভ করেছেন মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশ করলে আজও সেই প্রাচীন গাম্ভীর্য অনুভব করা যায়

পাঁশকুড়া ভবতারিণী মন্দিরে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলে নিচের তথ্যগুলো আপনাকে সাহায্য করবে:

. দর্শনের সময়সূচী (Timing)

সাধারণত মন্দিরটি প্রতিদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত নির্দিষ্ট বিরতিতে খোলা থাকে:

ভোর: :৩০ - :০০ (মঙ্গলারতি দিয়ে মন্দির খোলে)

দুপুর: ১২:৩০ - :০০ নাগাদ অন্নভোগের পর মন্দির সাময়িকভাবে বন্ধ হয়

বিকেল: :৩০ - :০০ নাগাদ আবার খোলে

রাত: :৩০ - :০০ নাগাদ সন্ধ্যারতি শীতলভোগের পর মন্দির বন্ধ হয়

বিশেষ দ্রষ্টব্য: অমাবস্যা বা বিশেষ উৎসবের দিন (যেমন কালীপূজা) মন্দির সারারাত খোলা থাকতে পারে এবং সময়ের কিছুটা পরিবর্তন হয়


. যাতায়াতের পথ (How to Reach)

পাঁশকুড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ জংশন হওয়ায় এখানে পৌঁছানো বেশ সহজ:

ট্রেনে (Train): হাওড়া স্টেশন থেকে মেদিনীপুর, খড়গপুর বা হলদিয়া লোকাল ধরে পাঁশকুড়া জংশন (Panskura Jn) স্টেশনে নামতে হবে স্টেশন থেকে টোটো বা রিকশায় করে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই মন্দিরে পৌঁছে যাওয়া যায়

বাসে (Bus): ধর্মতলা বা দিঘা রুটের যেকোনো বাস ধরে 'পাঁশকুড়া বাস স্ট্যান্ড' বা হাইওয়ের মোড়ে নামতে পারেন সেখান থেকে স্থানীয় পরিবহনে মন্দিরে যাওয়া সহজ

গাড়িতে (Car): কলকাতা থেকে কোলাঘাট হয়ে নম্বর জাতীয় সড়ক (NH6) দিয়ে পাঁশকুড়ায় ঢোকা যায় দূরত্ব প্রায় ৮০-৯০ কিলোমিটার


. নিকটবর্তী আকর্ষণ

আপনি যদি হাতে সময় নিয়ে যান, তবে মন্দিরের পাশাপাশি কংসাবতী নদীর পাড় এবং এখানকার বিখ্যাত ফুলের বাজার (যাকে বাংলার 'ফ্লাওয়ার ভ্যালি' বলা হয়) ঘুরে দেখতে পারেন

পাঁশকুড়ার ভবতারিণী মন্দিরকে ঘিরে যে ইতিহাস জনশ্রুতি রয়েছে, তা যেমন রোমাঞ্চকর তেমনই ভক্তি জাগানিয়া এই মন্দিরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি মূলত একটি শ্মশানপীঠ

নিচে এই মন্দিরের বিশেষ ইতিহাস অলৌকিক জনশ্রুতিগুলি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

. শ্মশানপীঠ থেকে মন্দির: ইতিহাসের মোড়

এই মন্দিরটি যেখানে অবস্থিত (বালিডাংরী এলাকা), সেটি একসময় ছিল কংসাবতী নদীর তীরের এক নির্জন এবং ভয়ঙ্কর শ্মশান জনশ্রুতি আছে যে, প্রায় ৫০-৬০ বছর আগে স্থানীয় ভুতনাথ প্রধান (যিনি বালিডাংরী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন) এবং বিষ্ণু রানা নামে দুই সাধক এই শ্মশানে মা কালীর সাধনা শুরু করেন পরবর্তীতে স্থানীয় মানুষ এবং পরাণ মান্না নামে এক ব্যক্তির বিশেষ উদ্যোগে ১৯৯৪ সালে বর্তমান পাকা মন্দিরটি গড়ে ওঠে

. জনশ্রুতি: অলৌকিক রক্ষা জাগ্রত দেবী

এই মন্দিরকে ঘিরে বেশ কিছু রোমাঞ্চকর বিশ্বাস স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত:

দুর্ঘটনা থেকে মুক্তি: নম্বর জাতীয় সড়কের (NH6) পাশেই এই শ্মশানপীঠ স্থানীয় গাড়ি চালক এবং ভক্তদের বিশ্বাস, মা এখানে অত্যন্ত জাগ্রত অনেক চালক দাবি করেন যে, বড় কোনো দুর্ঘটনার মুখে মা অলৌকিকভাবে তাঁদের রক্ষা করেছেন তাই আজও নতুন গাড়ি কিনলে বা দূরযাত্রার আগে এই মন্দিরে পূজা দেওয়া এক অঘোষিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে

ব্রাহ্মণহীন পূজা: এই মন্দিরের একটি বিশেষত্ব হলো এখানে সাধারণ পুরোহিতের বদলে অনেক সময় তন্ত্রসাধক বা সাধু প্রকৃতির ব্যক্তিরাই পূজা পরিচালনা করেন আজও অনেক ক্ষেত্রে প্রথাগত ব্রাহ্মণ ছাড়াই ভক্তির সাথে পূজা সম্পন্ন হয়, যা মায়ের কাছে মানুষের সরাসরি আত্মসমর্পণের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়

. মূর্তি পরিবেশের মাহাত্ম্য

কষ্টিপাথরের মূর্তি: মন্দিরের ভেতরের মা ভবতারিণী মূর্তিটি কষ্টিপাথরের তৈরি মায়ের পায়ের নিচে শ্বেতপাথরের মহাদেব শায়িত বলা হয়, গভীর রাতে শ্মশানে মায়ের আরতির সময় এক অদ্ভুত অলৌকিক নিস্তব্ধতা নেমে আসে

বিবাহ মানত: অনেকের মতে, এখানে নিষ্ঠাভরে মানত করলে তা পূরণ হয় যে কারণে প্রতিদিন এখানে বহু ভক্ত বিবাহ বা অন্য শুভ কাজের জন্য মায়ের আশীর্বাদ নিতে আসেন


একটি মজার তথ্য: যেহেতু এটি একটি শ্মশানপীঠ, তাই এখানে পুজোর ভোগে অনেক সময় প্রাচীন তান্ত্রিক রীতি মেনে নিরামিষ ভোগের পাশাপাশি বিশেষ রীতিও পালন করা হয়

পাঁশকুড়া ভবতারিণী মন্দিরের উৎসব এবং বিশেষ করে ভোগ বিতরণ নিয়ে ভক্তদের মধ্যে এক আলাদা উৎসাহ কাজ করে কারণ, এটি একটি শ্মশানপীঠ হওয়ায় এখানকার রীতিনীতি সাধারণ মন্দিরের চেয়ে কিছুটা আলাদা

নিচে উৎসব ভোগের বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হলো:

. দীপান্বিতা কালীপূজা (প্রধান উৎসব)

কার্তিক মাসের অমাবস্যায় এখানে সবথেকে বড় উৎসব পালিত হয়

বিশেষত্ব: এই রাতে মাকে রাজবেশে সাজানো হয় সারারাত ধরে তান্ত্রিক বৈদিক উভয় মতেই পূজা চলে

জনসমাগম: শুধু পাঁশকুড়া নয়, মেদিনীপুর, হাওড়া এবং কলকাতা থেকেও হাজার হাজার ভক্ত এই রাতে ভিড় করেন মন্দিরের আলোকসজ্জা এবং আতশবাজির প্রদর্শনী দেখার মতো হয়

. ভোগ বিতরণের বিশেষত্ব

এই মন্দিরের অন্নভোগ ভক্তদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র বা 'প্রসাদ' হিসেবে গণ্য হয়

প্রতিদিনের ভোগ: সাধারণত দুপুর ১২:৩০ থেকে :০০ টার মধ্যে অন্নভোগ দেওয়া হয় এতে থাকে ভাত, ডাল, ভাজা, তরকারি এবং অবশ্যই মায়ের প্রিয় খিচুড়ি

কালীপূজার বিশেষ ভোগ: অমাবস্যার পুজোর দিন বা বিশেষ উৎসবে ভোগের আয়োজন হয় বিশাল

ওই দিন হাজার হাজার মানুষের জন্য খিচুড়ি প্রসাদ, লাবড়া (পাঁচমিশালি তরকারি) এবং চাটনি বিতরণ করা হয়

অনেক সময় ভক্তদের মানত অনুযায়ী মাছ বা পাঁঠার মাংসের ভোগও নিবেদন করা হয় (যেহেতু এটি শ্মশানকালী বা তান্ত্রিক ধারার মন্দির), যা পরে ভক্তদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয়

. অন্যান্য উৎসব

রথযাত্রা: আষাঢ় মাসে রথযাত্রার সময় এখানে মেলা বসে এবং মন্দিরে বিশেষ পূজা হয়

মকর সংক্রান্তি: পৌষ সংক্রান্তির দিন কংসাবতী নদীতে স্নান সেরে ভক্তরা ভবতারিণী মায়ের চরণে জল ঢালেন এই দিনটিতেও মন্দির প্রাঙ্গণে খিচুড়ি ভোগের ব্যবস্থা থাকে


একটি ছোট টিপস:

আপনি যদি বিশেষ কোনো তিথিতে মন্দিরে গিয়ে প্রসাদ পেতে চান, তবে সকাল সকাল গিয়ে মন্দির কর্তৃপক্ষের বা সেবাইতদের সাথে কথা বলে 'কুপন' বা নাম নথিভুক্ত করিয়ে রাখা ভালো কারণ ভিড়ের সময় প্রসাদ পাওয়া কিছুটা কঠিন হতে পারে

 

0 Reviews