চাকমা রাজবংশ  কিংবদন্তি এবং ঐতিহাসিক তথ্য

চাকমা রাজবংশ কিংবদন্তি এবং ঐতিহাসিক তথ্য

Size

Read more

 



চাকমা রাজবংশ  কিংবদন্তি এবং ঐতিহাসিক তথ্য 

চাকমা রাজবংশের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন এবং বৈচিত্র্যময় কিংবদন্তি এবং ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, এই রাজবংশ কয়েকশ বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শাসন করে আসছে

নিচে চাকমা রাজবংশের ইতিহাসের প্রধান পর্যায়গুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:


. আদি ইতিহাস বিজয়গিরি

চাকমা ঐতিহ্যের তথ্যমতে, এই রাজবংশের আদি নিবাস ছিল ভারতের চম্পকনগর

রাজা বিজয়গিরি: তাকে চাকমা রাজবংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং আদি পুরুষ মনে করা হয় তিনি তার রাজ্য বিস্তার করতে করতে বর্তমান মায়ানমার (বার্মা) এবং পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে আসেন

তিনি তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে নতুন বসতি স্থাপন করেন এবং সেখান থেকেই আধুনিক চাকমা রাজবংশের গোড়াপত্তন হয়

. মোগল আমল কার্পাস মহল

মধ্যযুগে চাকমা রাজারা মোগল সম্রাটদের সাথে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ হন

কার্পাস মহল: চাকমারা মোগলদের তুলা (কার্পাস) কর হিসেবে দিত, যার বিনিময়ে তারা স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত

এই সময় চাকমা রাজারা 'খান' উপাধি গ্রহণ করেন (যেমন: শের দৌলত খাঁ, জান বক্স খাঁ), যা মোগলদের সাথে সুসম্পর্কের প্রতিফলন

. ব্রিটিশ শাসন রাঙামাটি স্থানান্তর

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে চাকমা রাজাদের কয়েকবার যুদ্ধ হয় পরবর্তীতে ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি পৃথক জেলা করা হয়

রাজধানী পরিবর্তন: আগে চাকমা রাজাদের রাজধানী ছিল আলিকদম বা রাঙ্গুনিয়ার দিকে পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে এটি বর্তমান রাঙামাটি শহরে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হয়

রানী কালিন্দী: ১৮৪৪ থেকে ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত তিনি রাজত্ব করেন তিনি চাকমা ইতিহাসের অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং বুদ্ধিমতী শাসক ছিলেন তিনি ব্রিটিশদের সাথে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে চাকমা সার্কেলের অধিকার রক্ষা করেছিলেন

. আধুনিক যুগ বর্তমান অবস্থা

বর্তমানে চাকমা রাজারা মূলত প্রথাগত বা আলঙ্কারিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন

রাজা ত্রিদিব রায়: পাকিস্তানের শাসনামলে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় তিনি রাজা ছিলেন

রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়: তিনি বর্তমান (৫১তম) চাকমা রাজা তিনি একজন বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী এবং আইনজীবী বর্তমানে তিনি চাকমা সার্কেলের প্রধান হিসেবে সামাজিক প্রথাগত বিচার এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন


চাকমা রাজবংশের বিশেষ বৈশিষ্ট্য:

বিষয়

বিবরণ

শাসন এলাকা

চাকমা সার্কেল (রাঙামাটি খাগড়াছড়ির কিছু অংশ)

রাজপ্রাসাদ

রাঙামাটি রাজদ্বীপ

প্রধান উৎসব

বিজু (রাজা প্রতিবছর বিজু উৎসবে জনগণকে শুভেচ্ছা জানান)

 

চাকমা রাজবংশের ইতিহাসে রানী কালিন্দী (১৮৪৪১৮৭৩) এক অনন্য এবং কিংবদন্তিতুল্য নাম তিনি ছিলেন চাকমা রাজবংশের ৪৫তম শাসক এবং প্রথম নারী যিনি অত্যন্ত শক্ত হাতে রাজকার্য পরিচালনা করেছিলেন তার শাসনকাল ছিল যেমন ঘটনাবহুল, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ

রানী কালিন্দীর শাসনকাল সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:


. ক্ষমতায় আরোহণ

রাজা ধরম বক্স খাঁ ১৮৩২ সালে মারা যাওয়ার পর কোনো পুত্রসন্তান না থাকায় উত্তরাধিকার নিয়ে বিবাদ শুরু হয় এক পর্যায়ে ব্রিটিশ সরকারের হস্তক্ষেপে এবং প্রজাদের সমর্থনে রানী কালিন্দী ১৮৪৪ সালে চাকমা সার্কেলের শাসনভার গ্রহণ করেন

. ব্রিটিশদের সাথে সংঘর্ষ বুদ্ধিমত্তা

রানী কালিন্দীর পুরো শাসনকালই ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘ লড়াই

স্বায়ত্তশাসন রক্ষা: ব্রিটিশরা যখন পাহাড়ের ওপর খাজনা বা ট্যাক্স আদায়ের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিল, রানী কালিন্দী তখন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে আইনি লড়াই চালিয়েছিলেন

রাজস্ব ব্যবস্থাপনা: তিনি কোম্পানির কাছে নতি স্বীকার না করে নিজের প্রশাসনিক ক্ষমতা বজায় রাখার চেষ্টা করেন তার সাহসিকতার জন্য ব্রিটিশ কর্মকর্তারাও তাকে সমীহ করতেন

. প্রশাসনিক সামাজিক সংস্কার

রানী কালিন্দী শুধু একজন শাসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক:

আদালত বিচার ব্যবস্থা: তিনি নিজস্ব বিচারালয় পরিচালনা করতেন এবং সামাজিক বিবাদ মেটাতে প্রথাগত আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করেন

ভূমি ব্যবস্থাপনা: পাহাড়ের জুম চাষিদের অধিকার রক্ষা এবং ভূমি বন্দোবস্ত নিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন

. ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অবদান

তিনি বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন

মহামুনি মন্দির: তার অন্যতম বড় কীর্তি হলো রাউজানের কাছে ঐতিহাসিক 'মহামুনি মন্দির' নির্মাণ আজও এই মন্দিরে চৈত্র সংক্রান্তিতে বিখ্যাত মহামুনি মেলা বসে

তিনি বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার এবং বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আবাসনের জন্য বহু বিহার নির্মাণ করেছিলেন


রানী কালিন্দীর শাসনকালের প্রধান সময়রেখা

বছর/কাল

বিশেষ ঘটনা

১৮৩২

স্বামী রাজা ধরম বক্স খাঁর মৃত্যু

১৮৪৪

আনুষ্ঠানিকভাবে শাসনভার গ্রহণ

১৮৬০

ব্রিটিশদের দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে স্বতন্ত্র জেলা ঘোষণা (এর ফলে রানীর ক্ষমতায় কিছু সীমাবদ্ধতা আসে)

১৮৭৩

এই মহান রানীর জীবনাবসান


পরবর্তী উত্তরাধিকার

রানী কালিন্দীর পর তার দৌহিত্র (মেয়ের ঘরের নাতি) হরিচন্দ্র রায় চাকমা রাজা হন রানী তাকেই ছোটবেলা থেকে যোগ্য শাসক হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন

একটি মজার তথ্য: রানী কালিন্দী এতটাই প্রভাবশালী ছিলেন যে, ব্রিটিশ নথিপত্রে তাকে একজন "অত্যন্ত বুদ্ধিমতী এবং স্বাধীনচেতা শাসক" হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে একজন নারী হয়ে পাহাড় শাসন করা ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা

রানী কালিন্দীর পরবর্তী সময়কাল এবং বর্তমান চাকমা রাজবাড়ির অবস্থা নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


. রাজা হরিচন্দ্র রায়ের শাসনকাল (১৮৭৩১৮৮৫)

রানী কালিন্দীর মৃত্যুর পর তার দৌহিত্র (মেয়ের ঘরের নাতি) হরিচন্দ্র রায় সিংহাসনে বসেন তবে তার শাসনকাল ছিল রানী কালিন্দীর তুলনায় কিছুটা ভিন্ন এবং চ্যালেঞ্জিং

উপাধি লাভ: ব্রিটিশ সরকার ১৮৭৪ সালে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'রাজা' উপাধি প্রদান করে এর আগে চাকমা শাসকরা মোগলদের দেওয়া 'খান' বা স্থানীয় উপাধি ব্যবহার করতেন

ব্রিটিশ প্রভাব: তার সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্রিটিশদের প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ অনেক বেড়ে যায় ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা হওয়ার পর রাজার ক্ষমতা মূলত 'সার্কেল চিফ' বা প্রথাগত প্রধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে

রাজধানী স্থানান্তর: তার আমলেই রাজবাড়ির প্রশাসনিক কাজকর্মে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে, যদিও তিনি তার মাতামহী রানী কালিন্দীর মতো অতটা কঠোর শাসক ছিলেন না


. চাকমা রাজবাড়ির বর্তমান অবস্থা (রাঙামাটি রাজদ্বীপ)

বর্তমানে চাকমা রাজবাড়ি রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদবেষ্টিত একটি সুন্দর দ্বীপে অবস্থিত, যা 'রাজদ্বীপ' নামে পরিচিত

ঐতিহাসিক গুরুত্ব: কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের সময় (১৯৬০-এর দশকে) পুরনো রাজবাড়িটি হ্রদের পানিতে তলিয়ে যায় বর্তমান রাজবাড়িটি পরবর্তীতে নতুন করে তৈরি করা হয়েছে

বর্তমান রাজা: বর্তমান (৫১তম) রাজা হলেন ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় তিনি ১৯৭৭ সাল থেকে রাজপদ অলঙ্কৃত করছেন

রাজার ভূমিকা: বর্তমানে রাজার ক্ষমতা মূলত প্রথাগত তিনি চাকমা সার্কেল চিফ হিসেবে পরিচিত তার প্রধান কাজগুলো হলো:

মৌজা প্রধান (হেডম্যান) গ্রাম প্রধানদের (কার্বারি) নিয়োগ নিয়ন্ত্রণ

সামাজিক প্রথাগত বিচারকার্য পরিচালনা

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ জেলা পরিষদের সাথে সমন্বয় করা

ভূমি সংক্রান্ত জটিলতায় প্রথাগত মত প্রদান

. রাজবাড়ির স্থাপত্য পরিবেশ

বর্তমান রাজবাড়িটি আধুনিক ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের সংমিশ্রণ এখানে একটি সুন্দর বৌদ্ধ বিহার (রাজবিহার) রয়েছে প্রতিবছর বিজু উৎসবের সময় রাজবাড়িটি জনসমাগমে মুখরিত হয়ে ওঠে সাধারণ পর্যটকরা বাইরে থেকে রাজবাড়িটি দেখতে পারেন, তবে ভেতরে প্রবেশের জন্য অনুমতির প্রয়োজন হয়


চাকমা রাজবংশের উত্তরাধিকার একনজরে (আধুনিক যুগ):

রাজা / শাসক

সময়কাল

মন্তব্য

রাজা ভুবন মোহন রায়

১৮৯৭১৯৩৩

তার সময়ে অনেক সমাজ সংস্কার হয়

রাজা নলিনাক্ষ রায়

১৯৩৩১৯৫১

ব্রিটিশ পাকিস্তান আমলের সন্ধিক্ষণে শাসক ছিলেন

রাজা ত্রিদিব রায়

১৯৫১১৯৭১

কাপ্তাই বাঁধের সময় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত রাজা ছিলেন

রাজা দেবাশীষ রায়

১৯৭৭বর্তমান

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আদিবাসী নেতা আইনজীবী

 



0 Reviews