Read more
মরমী কবি এবং বাউল সাধক হাসন রাজার বাড়ি (হাসন রাজা মিউজিয়াম) বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ শহরে অবস্থিত। এটি কেবল একটি সাধারণ বাড়ি নয়, বরং বাঙালি লোকসংস্কৃতি এবং সুফিবাদী দর্শনের এক অনন্য ঐতিহাসিক নিদর্শন।
নিচে হাসন রাজার বাড়ির ইতিহাস ও গুরুত্ব তুলে ধরা হলো:
১. হাসন রাজার পরিচয় ও পটভূমি
হাসন রাজা (১৮৫৪–১৯২২) ছিলেন একাধারে জমিদার, কবি এবং মরমী সাধক। তাঁর গান ও দর্শনে জীবনের নশ্বরতা এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর প্রেম ফুটে ওঠে। সুনামগঞ্জের লক্ষ্মণশ্রী এলাকায় সুরমা নদীর তীরে তাঁর এই পৈত্রিক নিবাস অবস্থিত।
২. বাড়ির ঐতিহাসিক বিবর্তন
জমিদারি আমল: হাসন রাজা তাঁর জীবনের অনেকটা সময় এখানে কাটিয়েছেন। একসময় তিনি খুব শৌখিন জমিদার ছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে আধ্যাত্মিক চেতনার সন্ধানে বিলাসবহুল জীবন ত্যাগ করেন।
মউ-মাছি ভবন: তাঁর মূল বাড়িটিকে স্থানীয়রা ‘মউ-মাছি’ ভবন নামেও চেনে। বাড়িটির স্থাপত্যে তৎকালীন জমিদারী আভিজাত্যের ছাপ রয়েছে।
মিউজিয়াম বা জাদুঘর: বর্তমানে তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখতে এই বাড়িটিকে একটি ব্যক্তিগত জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে, যার নাম ‘হাসন রাজা মিউজিয়াম’।
৩. জাদুঘরে যা যা রয়েছে
হাসন রাজার ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্যক্তিগত সামগ্রী এখানে অত্যন্ত যত্ন সহকারে সংরক্ষিত আছে:
বাদ্যযন্ত্র: তাঁর ব্যবহৃত একতারা ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র।
পোশাক ও আসবাবপত্র: তাঁর ব্যবহৃত আলখাল্লা, কাঠের খড়ম, চেয়ার এবং টেবিল।
পাণ্ডুলিপি: তাঁর বিখ্যাত গান ও কবিতার মূল পাণ্ডুলিপি।
ব্যক্তিগত সংগ্রহ: তাঁর প্রিয় তরবারি, পিস্তল এবং শৌখিন সামগ্রী।
৪. পর্যটন ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
প্রতিবছর দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক এবং গবেষক এই বাড়িটি পরিদর্শনে আসেন। বাড়িটি কেবল ইটের দেয়াল নয়, বরং এটি সিলেটের মরমি ধারার ইতিহাস বহন করছে। লোকসংগীতের প্রতি ভালোবাসা থেকে মানুষ এখানে তাঁর জীবনের গল্প শুনতে ও অনুভব করতে ভিড় জমায়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: হাসন রাজার মাজারটিও এই বাড়ির কাছেই গাজীর দরগায় অবস্থিত। যারা তাঁর বাড়ি দেখতে যান, তারা সাধারণত মাজারটিও জিয়ারত করে আসেন।
হাসন রাজার জীবন যেন এক রূপকথার গল্প, যা ভোগ-বিলাস থেকে ত্যাগের পথে আবর্তিত হয়েছে। তাঁর জীবনদর্শন এবং গানের মূল ভিত্তি হলো 'মরমিবাদ' (Mysticism), যেখানে দেহকে একটি খাঁচা এবং আত্মাকে একটি পাখি হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।
নিচে তাঁর জীবন ও একটি বিখ্যাত গানের সংক্ষেপে ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
হাসন রাজার জীবন: রাজকীয়তা থেকে বৈরাগ্য
হাসন রাজার জীবনকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
প্রথম জীবন (ভোগ-বিলাস): যৌবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত শৌখিন এবং প্রতাপশালী জমিদার। ঘোড়সওয়ারি, শিকার এবং জৌলুসপূর্ণ জীবনযাপন ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। সুনামগঞ্জের বিশাল জমিদারি পরিচালনা করতেন কঠোর হাতে।
দ্বিতীয় জীবন (আধ্যাত্মিক রূপান্তর): জীবনের এক পর্যায়ে তাঁর মধ্যে গভীর বৈরাগ্য জন্ম নেয়। তিনি বুঝতে পারেন পার্থিব ধন-সম্পদ চিরস্থায়ী নয়। তিনি তাঁর জমিদারি বিলিয়ে দিতে শুরু করেন এবং সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন শুরু করেন। এই সময়েই তিনি 'হাসন উদাস' নামে তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থটি রচনা করেন।
বিখ্যাত গানের ব্যাখ্যা: "লোকে বলে বলেরে ঘর বাড়ি ভালা না আমার"
এটি হাসন রাজার অন্যতম জনপ্রিয় গান। এই গানের মাধ্যমে তিনি মানুষের চিরন্তন আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা এবং জীবনের নশ্বরতাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
গানের মূল অংশ ও মর্মার্থ:
"লোকে বলে বলেরে ঘর বাড়ি ভালা না আমার, কি ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার।"
দেহের নশ্বরতা: এখানে 'ঘর' বলতে হাসন রাজা তাঁর নিজের শরীর বা দেহকে বুঝিয়েছেন। মানুষের শরীর মাটির তৈরি এবং একদিন তা মাটিতেই মিশে যাবে। তাই এই অস্থায়ী ঘর নিয়ে গর্ব করার কিছু নেই।
শূন্যের ঘর: 'শূন্যের মাঝার' কথাটি দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, এই পৃথিবীতে আমাদের স্থায়ী কোনো ঠিকানা নেই। মানুষের আসল ঠিকানা আধ্যাত্মিক জগতে, যা সাধারণ চোখে দেখা যায় না।
সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য: গানের পরবর্তী অংশে তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন যে, যদি তিনি জানতেন কতদিন এই পৃথিবীতে বাঁচবেন, তবে তিনি ঘর সাজানোর পেছনে সময় নষ্ট না করে কেবল সৃষ্টিকর্তার আরাধনা করতেন।
হাসন রাজার দর্শনের মূল দিকসমূহ
১. দেহ ও আত্মা: তিনি বিশ্বাস করতেন দেহ একটি মাটির খাঁচা, যার ভেতরে আত্মা বন্দী। ২. অসাম্প্রদায়িকতা: তাঁর গানে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সংস্কৃতির শব্দ এবং দর্শনের অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। ৩. নম্রতা: একজন বড় জমিদার হওয়া সত্ত্বেও তাঁর গানে নিজেকে 'কাঙাল' বা 'উদাস' হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
.jpg)
0 Reviews