Read more
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ডেবরা ব্লকের অন্তর্গত মাড়পুর (Madpur) গ্রামের মা মনসা মন্দির ওই অঞ্চলের অত্যন্ত প্রাচীন এবং জাগ্রত একটি দেবস্থান। এই মন্দিরের ইতিহাস ও মাহাত্ম্য স্থানীয় মানুষের কাছে অত্যন্ত গভীর।
নিচে মাড়পুর মনসা মন্দিরের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো:
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
মাড়পুরের মনসা পূজা ঠিক কত বছর আগে শুরু হয়েছিল তার সঠিক দাপ্তরিক নথি না থাকলেও, লোকমুখে প্রচলিত আছে যে এটি কয়েক শতাব্দী প্রাচীন। জনশ্রুতি অনুযায়ী, কোনো এক অলৌকিক স্বপ্নাদেশ বা অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমেই এখানে দেবী মনসার আরাধনা শুরু হয়। মাড়পুর গ্রামটি মূলত কৃষিনির্ভর হওয়ায় আদি লৌকিক দেবী হিসেবে মনসার প্রভাব এখানে অত্যন্ত বেশি।
২. মন্দিরের মাহাত্ম্য ও বিশ্বাস
এই মন্দিরটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে অনেক বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে:
আরোগ্য লাভ: স্থানীয়দের বিশ্বাস, দেবীর কাছে মানত করলে সর্পভয় থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এবং চর্মরোগসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দূর হয়।
জাগ্রত দেবী: ভক্তদের বিশ্বাস মা এখানে অত্যন্ত 'জাগ্রত'। প্রতি বছর বহু দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে পুজো দিতে আসেন।
৩. পূজা ও উৎসব
মাড়পুরের মনসা মন্দিরের মূল আকর্ষণ হলো বাৎসরিক পূজা:
শ্রাবণ মাস: সাধারণত শ্রাবণ মাসের সংক্রান্তিতে বা নাগপঞ্চমীর সময় এখানে বিশাল সমারোহে পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
মেলা: পূজা উপলক্ষে মন্দিরের সংলগ্ন এলাকায় বড় মেলা বসে। এই মেলায় স্থানীয় কুটির শিল্প এবং লোকজ সংস্কৃতির আদান-প্রদান ঘটে।
ঝাঁপান উৎসব: অনেক সময় মনসা পূজার অঙ্গ হিসেবে এখানে 'ঝাঁপান' (সাপ নিয়ে খেলা বা প্রদর্শনী) আয়োজিত হতো, যা বর্তমানে ঐতিহ্যের খাতিরে প্রতীকীভাবে পালিত হয়।
৪. মন্দিরের স্থাপত্য
বর্তমান মন্দিরটি সময়ের সাথে সাথে সংস্কার করা হয়েছে। প্রাচীন কাঠামোটি সাধারণ হলেও এখনকার মন্দিরটি বেশ সুসজ্জিত। মন্দিরের গর্ভগৃহে দেবীর মূর্তি বা অনেক ক্ষেত্রে দেবীর প্রতীক হিসেবে ঘট বা শিলা পূজা করা হয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: স্থানীয় ইতিহাস অনেক সময় মৌখিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। আপনি যদি নির্দিষ্ট কোনো বংশের ইতিহাস বা কোনো বিশেষ অলৌকিক কাহিনী সম্পর্কে জানতে চান, তবে জানাবেন।
মাড়পুর মনসা মন্দিরের প্রধান উৎসব মূলত ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে এবং শ্রাবণ মাসের নাগপঞ্চমীতে সবচেয়ে বড় আকারে পালিত হয়। তবে এলাকাভেদে এবং তিথিভেদে উৎসবের সময়গুলো নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. প্রধান উৎসব: ভাদ্র সংক্রান্তি
পশ্চিম মেদিনীপুর ও ডেবরা অঞ্চলে দেবী মনসার মূল পূজা সাধারণত ভাদ্র মাসের শেষ দিনে (ভাদ্র সংক্রান্তি) অনুষ্ঠিত হয়। এই দিনটিকে স্থানীয়ভাবে 'রান্নাপুজো' বা 'অরন্ধন' উৎসবের সাথে মিলিয়ে অত্যন্ত ভক্তির সাথে পালন করা হয়।
২. শ্রাবণ মাসের নাগপঞ্চমী
অনেকে আবার শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের নাগপঞ্চমী তিথিতেও দেবীর বিশেষ পূজা দিয়ে থাকেন। এই সময় মন্দিরে ভক্তদের সবথেকে বেশি ভিড় লক্ষ্য করা যায়।
৩. উৎসবের বিশেষ দিকগুলো:
ঝাঁপান উৎসব: পূজার পরের দিন বা পূজার দিন বিকেলে অনেক সময় 'ঝাঁপান' মেলা বসে, যেখানে ওঝা বা গুণিনরা সাপের খেলা দেখান (যদিও বর্তমানে এটি অনেকটা কমে এসেছে)।
মানত ও বলিদান: বহু ভক্ত তাঁদের মনস্কামনা পূর্ণ হওয়ার জন্য এই বিশেষ দিনগুলোতে মন্দিরে পাঁঠা বা অন্যান্য মানত উৎসর্গ করেন।
মেলা: উৎসব উপলক্ষে মন্দির প্রাঙ্গণে সাধারণত ৩ থেকে ৫ দিনের একটি মেলা বসে, যা স্থানীয় মানুষের মিলন উৎসবে পরিণত হয়।
একটি জরুরি তথ্য: প্রতি বছর পঞ্জিকা অনুযায়ী তিথি পরিবর্তিত হয়। যেহেতু আপনি ডেবরা অঞ্চলের কথা বলছেন, তাই ভাদ্র সংক্রান্তির (সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি) সময়টিই ওখানকার মূল উৎসবের সময় হিসেবে ধরে নেওয়া যায়।

0 Reviews