Read more
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের বর্ননায় বর্তমানে বাংলার স্থান সমুহ
বড়ু চণ্ডীদাস রচিত 'শ্রীকৃষ্ণকীর্তন' কাব্যটি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য নিদর্শন। এই কাব্যের কাহিনী মূলত রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও, এর বর্ণনায় তৎকালীন বাংলার যে ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ পাওয়া যায়, তার অনেক কিছুরই অস্তিত্ব বা প্রাসঙ্গিকতা আধুনিক বাংলার বিভিন্ন স্থানে খুঁজে পাওয়া যায়।
নিচে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের বর্ণনায় পাওয়া বর্তমান বাংলার সম্ভাব্য স্থান ও পরিবেশের একটি রূপরেখা দেওয়া হলো:
১. নানুর ও বীরভূম জেলা (কবির জন্মস্থান)
কাব্যের রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাসের জন্মস্থান ধরা হয় বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার নানুর গ্রামে।
বাসুলী দেবীর মন্দির: কাব্যের প্রতিটি খণ্ডের শেষে কবি 'বাসলী' বা 'বাসুলী' দেবীর বন্দনা করেছেন। বর্তমানে নানুর গ্রামে এই বাসুলী দেবীর প্রাচীন মন্দির ও বিগ্রহ রয়েছে, যা কাব্যের ঐতিহাসিক সত্যতাকে প্রমাণ করে।
ভৌগোলিক পরিবেশ: বীরভূমের লাল মাটি, ছোট ছোট নদী এবং গ্রামীণ পরিবেশের যে চিত্র কাব্যে ফুটে উঠেছে, তা মূলত এই অঞ্চলেরই প্রতিচ্ছবি।
২. মথুরা ও যমুনা (রূপক ও বাস্তব)
কাব্যে মথুরা হাটে দই-দুধ বিক্রি করতে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। যদিও ভৌগোলিক মথুরা উত্তরপ্রদেশে অবস্থিত, কিন্তু গবেষকদের মতে:
স্থানীয় মথুরা: বড়ু চণ্ডীদাস সম্ভবত বীরভূম বা বাঁকুড়া অঞ্চলের কোনো স্থানীয় গঞ্জ বা বাজারকে 'মথুরা' হিসেবে কল্পনা করেছেন।
যমুনা নদী: কাব্যে যমুনার কথা থাকলেও, বর্ণনা অনুযায়ী এটি বাংলার কোনো ছোট নদী (যেমন— অজয়, ময়ূরাক্ষী বা দামোদর) হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। বিশেষ করে নৌকাকখণ্ডে যে খরস্রোতা নদীর বর্ণনা আছে, তা বাংলার নদীমাতৃক রূপকেই তুলে ধরে।
৩. বৃন্দাবন ও কদম্ব তলা
রাধা-কৃষ্ণের লীলাভূমি হিসেবে বৃন্দাবনের কথা বলা হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে বৃন্দাবনের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা উত্তর ভারতের বৃন্দাবনের চেয়ে বাংলার গ্রামীন অরণ্য ও লতাপাতার সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বংশীখণ্ড ও কদম্ব গাছ: কাব্যে উল্লিখিত কদম্ব তলা বা বাঁশঝাড়ের যে নিবিড় বনানীর বর্ণনা আছে, তা মূলত তৎকালীন রাঢ় বাংলার (বাঁকুড়া ও বীরভূম) গভীর অরণ্যের রূপ।
৪. যাতায়াতের পথ ও ঘাট
রাধা ও অন্যান্য গোয়ালিনীরা যে পথে দই-দুধের পসরা নিয়ে যেতেন, সেই পথটি বাংলার চিরচেনা মেঠো পথ।
দানখণ্ড: শুল্ক বা 'দান' আদায়ের জন্য কৃষ্ণ যে ঘাটে বসে থাকতেন, সেটি মূলত বাংলার নদীতীরবর্তী প্রাচীন খেয়াঘাটগুলোর একটি প্রতিরূপ। বর্তমানের বীরভূম ও বাঁকুড়া জেলার বিভিন্ন নদীতীরবর্তী জনপদগুলোতে এই ধরনের ভৌগোলিক কাঠামোর মিল পাওয়া যায়।
৫. লোকায়ত ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট
স্থানের নাম সরাসরি আধুনিক মানচিত্রের সাথে সব ক্ষেত্রে না মিললেও, নিচের বিষয়গুলো বর্তমান বাংলার এই স্থানগুলোকে চিহ্নিত করে:
ছাতনা (বাঁকুড়া): অনেক গবেষক মনে করেন বড়ু চণ্ডীদাস বাঁকুড়া জেলার ছাতনার অধিবাসী ছিলেন। সেখানেও বাসুলী দেবীর মন্দির এবং কাব্যের বর্ণনার সাথে মিলসম্পন্ন পরিবেশ পাওয়া যায়।
সারসংক্ষেপ টেবিল
|
কাব্যে উল্লিখিত স্থান/পরিবেশ |
বর্তমান সম্ভাব্য অবস্থান |
|
বাসুলী মন্দির |
নানুর (বীরভূম) অথবা ছাতনা (বাঁকুড়া)। |
|
মথুরা হাট |
তৎকালীন স্থানীয় কোনো বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র বা গঞ্জ। |
|
যমুনা নদী |
অজয়, ময়ূরাক্ষী বা দামোদর নদের অববাহিকা। |
|
বৃন্দাবন |
রাঢ় বাংলার শাল-পিয়াল ও কদম্ব ঘেরা অরণ্য অঞ্চল। |

0 Reviews