Read more
প্রাকৃত অপভ্রংশ কাব্যের বর্ননায় বর্তমানে বাংলার স্থান সমুহ
প্রাকৃত ও অপভ্রংশ সাহিত্যে (বিশেষ করে অবহট্ট স্তরে) সরাসরি বর্তমানের মতো জেলাভিত্তিক সীমানা না থাকলেও, তৎকালীন 'গৌড়-বঙ্গ' বা 'প্রাচ্য' অঞ্চলের বর্ণনায় আধুনিক বাংলার বেশ কিছু ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক স্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
নিচে প্রাকৃত-অপভ্রংশ কাব্যের বর্ণনায় বর্তমান বাংলার স্থানসমূহের প্রতিফলন আলোচনা করা হলো:
১. গৌড় (বর্তমান মালদহ ও মুর্শিদাবাদ)
অপভ্রংশ ও প্রাকৃত সাহিত্যে 'গৌড়' শব্দটির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।
বর্তমান অবস্থান: এটি বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ জেলা এবং মুর্শিদাবাদ জেলার কিছু অংশ নিয়ে গঠিত ছিল।
বর্ণনা: তৎকালীন কাব্যে গৌড়কে বিদ্যা, সংস্কৃতি এবং ঐশ্বর্যের কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এখানকার নারীদের সৌন্দর্য এবং পুরুষদের পাণ্ডিত্যের কথা বিভিন্ন শ্লোকে পাওয়া যায়।
২. বঙ্গ ও রাঢ় (দক্ষিণ ও পশ্চিম বঙ্গ)
প্রাকৃত পৈঙ্গল বা বিভিন্ন অপভ্রংশ দোহার বর্ণনায় 'বঙ্গ' এবং 'রাঢ়' অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়।
বঙ্গ (পূর্ববঙ্গ): এটি মূলত বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা, বিক্রমপুর ও ফরিদপুর অঞ্চলকে নির্দেশ করত। 'বঙ্গাল' দেশের মানুষের ভাষা ও জীবনযাত্রা নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক বা কৌতূহলী বর্ণনা অপভ্রংশ কাব্যে দেখা যায়।
রাঢ় (পশ্চিমবঙ্গ): বর্তমান বীরভূম, বাঁকুড়া, বর্ধমান ও মেদিনীপুর অঞ্চল। এখানকার রুক্ষ মাটি, শাল বন এবং অরণ্যচারী মানুষের জীবনচিত্র অপভ্রংশ সাহিত্যে ফুটে উঠেছে।
৩. সমতট ও হরিকেল (পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গ)
প্রাচীন প্রাকৃত লিপি ও কিছু কাব্যিক বর্ণনায় উপকূলীয় অঞ্চলের ইঙ্গিত মেলে।
বর্তমান অবস্থান: এটি বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম অঞ্চল।
বর্ণনা: এই অঞ্চলগুলো তখন সমুদ্র বা নদীতীরবর্তী বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
৪. পুণ্ড্রবর্ধন (উত্তরবঙ্গ)
প্রাকৃত সাহিত্যে উত্তরবঙ্গের উর্বর ভূমি এবং কৃষি ব্যবস্থার প্রশংসা পাওয়া যায়।
বর্তমান অবস্থান: এটি বর্তমান বাংলাদেশের বগুড়া (মহাস্থানগড়), দিনাজপুর এবং পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর ও মালদহ জেলা।
নিদর্শন: এখানকার পলিমাটি ও আখের (ইক্ষু) চাষের বর্ণনা তৎকালীন সাহিত্যে খুবই প্রসিদ্ধ ছিল।
প্রাকৃত-অপভ্রংশ ও আধুনিক বাংলার তুলনামূলক সারণি:
|
প্রাচীন নাম (কাব্য অনুযায়ী) |
বর্তমান ভৌগোলিক স্থান |
প্রধান বৈশিষ্ট্য |
|
গৌড় |
মালদহ, মুর্শিদাবাদ (পশ্চিমবঙ্গ)। |
রাজধানী, পাণ্ডিত্য ও রাজকীয় জাঁকজমক। |
|
রাঢ় |
বীরভূম, বাঁকুড়া, বর্ধমান। |
লাল মাটি, বনজ সম্পদ ও শ্রমজীবী মানুষ। |
|
বঙ্গ/বঙ্গাল |
ঢাকা, বিক্রমপুর (বাংলাদেশ)। |
নদীমাতৃক জীবন ও নৌকাকেন্দ্রিক বাণিজ্য। |
|
পুণ্ড্র |
বগুড়া, দিনাজপুর, মালদহ। |
উন্নত কৃষি ও প্রাচীন নগর সভ্যতা। |
৫. গঙ্গা ও ভাগীরথী তীর
প্রাকৃত কাব্যে গঙ্গা নদীর পবিত্রতা ও এর দুপাশের জনপদের বর্ণনা পাওয়া যায়। বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের নদীবিধৌত জনপদগুলোই সেই প্রাচীন বর্ণনার বাস্তব রূপ।

0 Reviews