Read more
চর্যাপদের সমাজচিত্র
চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন (খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী)। চর্যাপদের পদগুলো মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের সাধন-ভজন সম্পর্কিত হলেও, এর রূপক ও উপমার অন্তরালে তখনকার বাংলার গ্রামীণ সমাজ, প্রকৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার এক জীবন্ত ছবি ফুটে উঠেছে।
চর্যাপদের প্রেক্ষাপটে বাংলার গ্রাম ও জনজীবনের প্রধান নিদর্শনগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:
১. ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রকৃতি
চর্যাপদের বর্ণনায় তখনকার গ্রামগুলো সাধারণত নদী বা খালের ধারে অবস্থিত ছিল।
নদীমাতৃক বাংলা: পদগুলোতে গঙ্গা, যমুনা ও ধামনা নদীর উল্লেখ পাওয়া যায়।
বনভূমি: গ্রামের আশেপাশে ছিল ঘন বন ও টিলা (যাকে পদে 'টিঅ' বলা হয়েছে)। শবর ও শবরীরা এই উঁচু পাহাড়ি এলাকায় বা বনে বসবাস করত।
২. ঘরবাড়ি ও বসতি
তৎকালীন গ্রামগুলোর ঘরবাড়ি ছিল অত্যন্ত সাধারণ এবং নশ্বর উপকরণের তৈরি।
কাঠামো: বাড়ি তৈরিতে বাঁশ, খড় ও ছন ব্যবহার করা হতো।
আর্থিক অবস্থা: অনেক পদের বর্ণনায় চরম দারিদ্র্যের চিত্র পাওয়া যায়। ঢেন্ঢণ পার একটি পদে আছে— "টালত মোর ঘর নাহি পড়বেষী / হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী"। অর্থাৎ, টিলার ওপর আমার ঘর, কোনো প্রতিবেশী নেই; হাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ প্রতিদিন মেহমান আসে।
আঙিনা: ঘরের সামনে আঙিনা এবং চারদিকে বেড়া দেওয়ার চল ছিল।
৩. গ্রামীণ পেশা ও জীবনযাত্রা
চর্যাপদের গ্রামগুলোতে বিভিন্ন শ্রমজীবী মানুষের বসবাস ছিল।
পেশা: মানুষ মূলত কৃষি, মাছ ধরা, নৌকা চালানো, তাঁত বোনা এবং মাদুর তৈরির কাজ করত।
নৌকা ও নদী: নদী পারাপারের জন্য খেয়াঘাট এবং নৌকার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ডোম ও চণ্ডালরা সাধারণত নৌকা চালানোর কাজ করত।
শিকার: বন্য অঞ্চলে বসবাসকারী শবররা তীর-ধনুক দিয়ে হরিণ শিকার করত।
৪. খাদ্য ও কৃষি
গ্রামীণ অর্থনীতি ছিল কৃষিভিত্তিক।
প্রধান ফসল: ধানের চাষ ছিল প্রধান। এছাড়া কার্পাস তুলা ও সরিষার উল্লেখ পাওয়া যায়।
খাদ্যতালিকা: ভাত ছিল বাঙালির প্রধান খাদ্য। মাছ ধরার সরঞ্জাম হিসেবে জাল এবং খালুইয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে মাছ ধরা ও খাওয়া গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল।
৫. সামাজিক উৎসব ও বাদ্যযন্ত্র
গ্রামের মানুষ অভাবের মধ্যেও আনন্দ-উৎসব পালন করত।
বিবাহ: চর্যাকাররা বিবাহের চমৎকার রূপক বর্ণনা করেছেন। বিয়েতে যৌতুক দেওয়ার প্রথা এবং বরযাত্রী নিয়ে শোভাযাত্রার উল্লেখ আছে।
বিনোদন: নাচে-গানে গ্রামগুলো মুখরিত থাকত। মাদল, করতাল, বাঁশি এবং বীণার মতো বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ছিল সাধারণ।
সারকথা: চর্যাপদের গ্রামগুলো ছিল আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বর্জিত, দারিদ্র্যপীড়িত কিন্তু প্রকৃতির খুব কাছের। বর্ণপ্রথা এবং অস্পৃশ্যতার কারণে অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ (ডোম, শবর, চণ্ডাল) মূল গ্রামের বাইরে বা উঁচু টিলায় বসবাস করত।

0 Reviews