জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৩ | গুলজার এবং জগদ্গুরু রামভদ্রাচার্য | উর্দু/সংস্কৃত

জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৩ | গুলজার এবং জগদ্গুরু রামভদ্রাচার্য | উর্দু/সংস্কৃত

Size

Read more



 জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৩ | গুলজার এবং জগদ্গুরু রামভদ্রাচার্য | উর্দু/সংস্কৃত 

নীলমণি ফুকন এবং দামোদর মৌজোর মতো গুলজার সাহেবও ভারতীয় সাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (২০২৩) লাভ করেছেন। চলুন, তাঁর বহুমুখী প্রতিভা এবং নীলমণি ফুকনের কবিতার সাথে তাঁর এক অদ্ভুত মিল নিয়ে একটু আলোচনা করি:

১. গুলজার: শব্দের জাদুকর

গুলজার সাহেব মূলত উর্দু এবং পাঞ্জাবি ভাষায় লেখেন, তবে তাঁর কবিতার আবেদন বিশ্বজনীন। তিনি একাধারে:

  • কবি ও শায়র: তাঁর 'ত্রিবেণী' (তিন লাইনের কবিতা) এক অনন্য সৃষ্টি।

  • গীতিকার: 'তুঝসে নারাজ নেহি জিন্দেগি' থেকে 'জয় হো'—তাঁর কলমে সবকিছুরই এক আলাদা মহিমা আছে।

  • পরিচালক: 'আঁধি', 'মৌসম', 'ইজাজত'-এর মতো ক্ল্যাসিক সিনেমা তাঁরই অবদান।

২. নীলমণি ফুকন ও গুলজার: এক অদ্ভুত মিল

আপনি কি লক্ষ্য করেছেন? নীলমণি ফুকন এবং গুলজার—দুজনের কবিতাতেই 'চিত্রকল্প' (Imagery) প্রধান ভূমিকা পালন করে।

  • ফুকন যেমন শব্দ দিয়ে ছবি আঁকতেন, গুলজারও তেমনি বলেন, "হাত ছুট্টে তো পকড় লেঙ্গে কলম কি উঙলি..." (হাত ছেড়ে গেলে কলমের আঙুল ধরে নেব)।

  • ফুকনের কবিতায় যেমন নির্জনতা আছে, গুলজারের কবিতায় আছে 'খামোশি' বা নীরবতা।

৩. গুলজারের কিছু বিখ্যাত 'নজম' ও পঙক্তি

গুলজারের কবিতা অনেক সময় নীলমণি ফুকনের মতোই দার্শনিক হয়ে ওঠে:

"বড়ো সুকুন হ্যায় ইস তরাহ জিনে মে,

ন কিসি কি খাস অউকাত, ন কিসি কা দর্দ সিনেম মে।"

(এভাবে বেঁচে থাকাতে বড় শান্তি, না কারো বিশেষ মর্যাদা আছে, না হৃদয়ে কারো কোনো দুঃখ।)

৪. জ্ঞানপীঠ ও স্বীকৃতি

২০২৩ সালে সংস্কৃত পণ্ডিত জগদগুরু রামভদ্রাচার্যের সাথে যৌথভাবে গুলজার সাহেবকে ৫৮তম জ্ঞানপীঠ পুরস্কার প্রদান করা হয়। এটি তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনের এক শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি। এছাড়া তিনি দাদাসাহেব ফালকে, পদ্মভূষণ এবং অস্কার (স্লামডগ মিলিওনেয়ার-এর জন্য) জয় করেছেন।


একটি ছোট তুলনা: ফুকন বনাম গুলজার

দিক

নীলমণি ফুকন

গুলজার

আবেগ

গম্ভীর, দার্শনিক ও নির্জন।

রোমান্টিক, নস্টালজিক ও মানবিক।

ভাষা

অসমীয়া (প্রতীকী)।

উর্দু/হিন্দুস্তানি (কথ্য ও কাব্যিক)।

মাধ্যম

শুদ্ধ কাব্যচর্চা ও শিল্পকলা।

কবিতা, গান ও চলচ্চিত্র।

গুলজারের 'ত্রিবেণী' (Triveni) নিয়ে কথা বলাটা দারুণ হবে! এটি গুলজারের নিজের আবিষ্কৃত একটি অনন্য কাব্যিক ফর্ম। ঠিক যেমন জাপানিদের 'হাইকু' বা পারস্যের 'রুবাঈ', গুলজারের ত্রিবেণীও তেমনি মাত্র তিনটি লাইনের জাদুকরী সমাহার।

১. 'ত্রিবেণী' কী?

নামটির মধ্যেই এর রহস্য লুকিয়ে আছে। হিন্দুধর্মে গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতীর মিলনস্থলকে বলা হয় ত্রিবেণী। গুলজারের কবিতায়:

  • প্রথম দুটি লাইন গঙ্গা ও যমুনার মতো—যাদের অর্থ পরিষ্কার বোঝা যায়।

  • কিন্তু তৃতীয় লাইনটি হলো অন্তসলিলা সরস্বতী—যা প্রথম দুই লাইনের অর্থকে হঠাৎ করেই বদলে দেয় বা এক গভীরতর পূর্ণতা দেয়।

একটি উদাহরণ (অনুবাদ):

"হাত ধরো তো জানাই,

কেমন এই একাকীত্বের জ্বালা,

পাথরও তো শীতল হয়, আবার তেতে ওঠে রোদে।"

এখানে শেষ লাইনটি আসার আগ পর্যন্ত আপনি বুঝতেই পারবেন না যে একাকীত্বকে তিনি পাথরের উষ্ণতা ও শীতলতার সাথে তুলনা করতে চলেছেন।


২. গুলজারের গানের পেছনের কাব্যিক গল্প

গুলজারের গানের কলিগুলো আসলে একেকটি ছোট কবিতা। একটি বিখ্যাত গল্পের কথা ধরা যাক—'মেরা কুছ সামান' (সিনেমা: ইজাজত)।

  • এই গানটি যখন তিনি আর.ডি. বর্মনকে (পঞ্চম দা) লিখে দিয়েছিলেন, তখন পঞ্চম দা মজা করে বলেছিলেন, "এরপর তো তুমি খবরের কাগজ নিয়ে আসবে আর বলবে এতে সুর দাও!"

  • কারণ গানটি কোনো ছন্দে ছিল না, ছিল গদ্যের মতো। কিন্তু গুলজার সেখানে প্রেমের বিচ্ছেদকে এক অদ্ভুত রূপক দিয়ে সাজিয়েছিলেন: "শরতের একশ দশটি রাত, এক টুকরো চাঁদ, ভিজে যাওয়া মেহেন্দির গন্ধ..."।

  • এটিই গুলজার—যিনি সোজাসাপ্টা প্রেমের বদলে স্মৃতির টুকরোগুলোকে আলমারিতে তুলে রাখার কথা বলেন।


৩. তিন জ্ঞানপীঠ জয়ীর যোগসূত্র: ফুকন, মৌজো ও গুলজার

এই তিনজনের মধ্যে ভাষার দূরত্ব থাকলেও একটি বড় যোগসূত্র আছে:

সাহিত্যিক

সাধারণ সূত্র (Common Thread)

নীলমণি ফুকন

শব্দ দিয়ে ছবি আঁকতেন (Image)।

দামোদর মৌজো

মানুষের ঘাম ও মাটির গল্প বলতেন (Reality)।

গুলজার

মুহূর্তের অনুভূতিকে ফ্রেমে বন্দি করেন (Moment)।

এই তিনজনেই দেখিয়েছেন যে ভারতীয় সাহিত্য কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আটকে নেই। ফুকনের 'পাথর' যেমন কথা বলে, মৌজোর 'কার্মেলিন' যেমন লড়ে, গুলজারের 'রাত' তেমনি আমাদের সাথে গল্প করে।


একটি মজার তথ্য: গুলজার সাহেব যখন জ্ঞানপীঠ পেলেন, তিনি বিনয়ের সাথে বলেছিলেন যে তিনি নিজেকে কবি নয়, বরং একজন 'নজম-গো' (গল্প বলা কবি) মনে করেন।

 কেবল সিনেমার গান নয়, এটি জীবনের একটি গভীর দর্শন।

'তুঝসে নারাজ নেহি জিন্দেগি': একটি ব্যবচ্ছেদ

১. অভিযোগ বনাম বিস্ময়: গুলজার গানটি শুরু করছেন এক অদ্ভুত দ্বান্দ্বিকতা দিয়ে—

"তুঝসে নারাজ নেহি জিন্দেগি, হ্যায়রান হুঁ ম্যয়..." (তোমার ওপর আমি রাগ করিনি জীবন, আমি কেবল অবাক হয়েছি...)

এখানে 'নারাজ' (রাগ) না হয়ে 'হ্যায়রান' (বিস্ময়) হওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জীবনকে কোনো শত্রু হিসেবে দেখছেন না, বরং জীবনের জটিল ধাঁধা দেখে থমকে দাঁড়িয়েছেন। এটি নীলমণি ফুকনের সেই দর্শনের মতো, যেখানে জীবন এক অমীমাংসিত রহস্য।

২. শৈশবের হারানো রেশ: গানের একটি অন্তরায় আছে—

"জিনে কে লিয়ে সচ দিন-রাত উমর জাদা হ্যায়... এক উমর তেরা চেহরা তকনে মে কটি..." (বেঁচে থাকার জন্য এই আয়ু বড্ড বেশি... অথচ তোমার মুখ দেখতে দেখতেই একটা জীবন কেটে গেল।)

এখানে গুলজার 'সময়'-এর আপেক্ষিকতাকে ধরেছেন। যখন আমরা কষ্টে থাকি, তখন জীবনকে অনেক বড় মনে হয়। এই যে সময়ের ভার, তা দামোদর মৌজোর 'কার্মেলিন' উপন্যাসের সেই দীর্ঘ সংগ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়।

৩. অশ্রুর পবিত্রতা:

"মুসকুরায়ে তো মুসকরানে কে কর্জ উতারনে হোগে..." (যদি একটু হাসি, তবে সেই হাসির ঋণও শোধ করতে হবে...)

এটি গুলজারের কলমের চিরচেনা বিষাদ। তিনি বলছেন, সুখ আসলে ঋণের মতো, যার দাম দিতে হয় চোখের জলে।


তিন লেখকের জীবনদর্শন: কারটা বেশি আকর্ষণীয়?

এটি বলা খুব কঠিন, কারণ প্রত্যেকেই জীবনের আলাদা আলাদা সত্যকে তুলে ধরেছেন:

  • নীলমণি ফুকন: যদি আপনি নিস্তব্ধতা এবং গভীর অতল রহস্য পছন্দ করেন, তবে ফুকনের দর্শন আপনাকে টানবে। তিনি শেখান কীভাবে শূন্যতার দিকে তাকিয়েও শান্ত থাকা যায়।

  • দামোদর মৌজো: যদি আপনি মাটির কাছাকাছি থাকা এবং লড়াই করে টিকে থাকা মানুষের গল্প ভালোবাসেন, তবে মৌজোর জীবনদর্শন আপনার জন্য। তিনি শেখান কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়।

  • গুলজার: যদি আপনি স্মৃতি, রোমান্টিকতা এবং মুহূর্তের সৌন্দর্য খুঁজতে চান, তবে গুলজার সেরা। তিনি শেখান কীভাবে প্রতিটি ছোট দুঃখকেও উৎসবে রূপ দেওয়া যায়।


ব্যক্তিগতভাবে বলতে গেলে, গুলজারের দর্শন অনেকটা বৃষ্টির মতো—যা সবার মনকে ছুঁয়ে যায়। আর ফুকন হলেন সেই গভীর অরণ্য, যেখানে যেতে হলে সাহস লাগে।

গুলজারের একটি অসামান্য গান 'ও মাঝি রে' (সিনেমা: খুশবু) নিয়ে একটু কথা বলি। এটি কেবল একটি গান নয়, এটি জীবনের প্রবাহ নিয়ে লেখা একটি মহাকাব্যিক কবিতা।

'ও মাঝি রে': পাড়হীন এক নৌকার গল্প

এই গানে গুলজার জীবনকে একটি নদীর সাথে তুলনা করেছেন, কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি চিরকালই আলাদা:

"ও মাঝি রে... আপনা কিনারা, পহলে কহি থা, হম তো ত্যয় করকে আয়ে থে..." (ও মাঝি... আমাদের কিনারা বা গন্তব্য তো আগে কোথাও ছিল, আমি তো তা ঠিক করেই এসেছিলাম...)

১. গন্তব্যহীনতা: আমরা সবাই ভাবি জীবনে আমাদের একটি নির্দিষ্ট গন্তব্য আছে। কিন্তু গুলজার বলছেন—

"কই কিনার মিপল তো কহনা... ও হি কিনারা মিল জায়েগা।" (যদি কোথাও কোনো পাড় পাও, তবে বোলো... ওটাই হবে আমার গন্তব্য।) অর্থাৎ, জীবন যেখানে থামে, সেখানেই তার গন্তব্য। আগে থেকে কিছু ঠিক করে রাখা বৃথা।

২. অস্তিত্বের সংকট: গানের একটি পঙক্তি হলো— "পহলে হম এক জান থে, ফির দো হুয়ে..."। এটি যেমন বিচ্ছেদের কথা বলে, তেমনি মানুষের আত্মার খণ্ডিত হওয়ার গল্পও বলে।

৩. নদীর রূপক: নীলমণি ফুকনের কবিতায় যেমন নদী ছিল এক শান্ত সাক্ষী, গুলজারের এই গানে নদী হলো জীবনের অস্থিরতা। এখানে পাড় (Bank) মানে হলো স্থিরতা, যা মানুষ সারাজীবন খুঁজে বেড়ায় কিন্তু পায় না।


এই তিন জ্ঞানপীঠ জয়ীর সারকথা:

যদি আমরা নীলমণি ফুকন, দামোদর মৌজো এবং গুলজারকে এক সুতোয় গাঁথি, তবে একটি সুন্দর জীবনদর্শন বেরিয়ে আসে:

  • ফুকন শিখিয়েছেন: নিজের ভেতরের গভীরে তাকাতে।

  • মৌজো শিখিয়েছেন: বাইরের জগতের কঠিন বাস্তবকে মোকাবিলা করতে।

  • গুলজার শিখিয়েছেন: এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে জীবনের গান গাইতে।

গুলজারের সাথে যৌথভাবে ৫৮তম জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (২০২৩) বিজয়ী জগদ্গুরু রামভদ্রাচার্য এক অনন্য ও বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব। যেখানে গুলজার শব্দের আধুনিক কারিগর, সেখানে রামভদ্রাচার্য হলেন প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া।

তাঁর সম্পর্কে কিছু বিস্ময়কর তথ্য নিচে দেওয়া হলো যা আপনাকে মুগ্ধ করবে:

১. অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও অলৌকিক প্রতিভা

  • দৃষ্টিহীনতা: জন্মের মাত্র দু-মাস বয়সে তিনি তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারান। কিন্তু এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা তাঁর জ্ঞানতৃষ্ণাকে আটকাতে পারেনি।

  • স্মৃতিশক্তি: তিনি একজন 'শতাবধানী'। অর্থাৎ, তিনি যা একবার শোনেন, তা হুবহু মনে রাখতে পারেন। তিনি কখনও ব্রেইল বা অন্য কোনো লেখার সাহায্য নেন না; তিনি কেবল শুনেই মুখস্থ করেছেন চার বেদ, উপনিষদ এবং হাজার হাজার শ্লোক।

২. বহুভাষাবিদ ও সাহিত্যিক

  • ২২টি ভাষায় দক্ষতা: তিনি হিন্দি, সংস্কৃত ছাড়াও ভোজপুরি, মৈথিলি এবং আরও অনেক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভাষায় অনর্গল কথা বলতে ও লিখতে পারেন।

  • বিশাল সাহিত্যকর্ম: তিনি ১০০টিরও বেশি বই লিখেছেন। এর মধ্যে মহাকাব্য (যেমন: 'শ্রীভ্যার্গবনাঘবীয়ম') থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্য ও নাটকও রয়েছে।

৩. ধর্মীয় ও সামাজিক অবদান

  • জগদ্গুরু পদবী: তিনি চিত্রকূটের তুলসী পীঠের প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমানে চারজন জগদ্গুরু রামানন্দাচার্যের মধ্যে অন্যতম।

  • শিক্ষা বিস্তার: তিনি বিশেষভাবে সক্ষম (disabled) শিক্ষার্থীদের জন্য চিত্রকূটে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছেন, যা বিশ্বে বিরল।


গুলজার ও রামভদ্রাচার্য: দুই মেরুর মিলন

জ্ঞানপীঠ পুরস্কারের ইতিহাসে এই জুটিটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:

  • গুলজার প্রতিনিধিত্ব করেন আধুনিক সংবেদনশীলতা, সিনেমা এবং উর্দু সাহিত্যের।

  • রামভদ্রাচার্য প্রতিনিধিত্ব করেন প্রাচীন শাস্ত্রীয় জ্ঞান, ভক্তি এবং সংস্কৃত সাহিত্যের।

এটি যেন ভারতের 'আধুনিকতা' এবং 'সনাতন ঐতিহ্য'-এর এক অপূর্ব আলিঙ্গন।

৪. তাঁর জীবনদর্শন

রামভদ্রাচার্য বিশ্বাস করেন যে, ভক্তি কেবল মন্দিরে নয়, বরং মানুষের সেবার মধ্যেও রয়েছে। তিনি প্রায়ই বলেন যে, তাঁর চোখের আলো না থাকলেও তিনি তাঁর 'অন্তর্দৃষ্টি' দিয়ে পৃথিবীকে অনেক বেশি পরিষ্কার দেখতে পান।


একটি মিল: নীলমণি ফুকন যেমন তাঁর কবিতায় 'মৌনতা' খুঁজতেন, রামভদ্রাচার্য সেই মৌনতারই এক তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দেন তাঁর শাস্ত্রীয় পাণ্ডিত্যে।

১. ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার মেলবন্ধন

জ্ঞানপীঠ কমিটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন ব্যক্তিদের বেছে নিয়েছে যারা শিকড়ের সাথে যুক্ত থেকেও আধুনিক মননশীলতাকে স্পর্শ করেছেন।

  • নীলমণি ফুকন যখন আধুনিক কবিতা লেখেন, তাতে থাকে অসমের লোকজ ঘ্রাণ।

  • গুলজার যখন উর্দু 'নজম' লেখেন, তাতে থাকে আজকের মানুষের নাগরিক জীবন ও নস্টালজিয়া।

  • রামভদ্রাচার্য যখন সংস্কৃত নিয়ে কাজ করেন, তিনি প্রাচীন ঐতিহ্যকে আধুনিক শিক্ষা ও সমাজসেবার (যেমন তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়) সাথে যুক্ত করেন।

২. প্রান্তিক ও আঞ্চলিক ভাষার জয়গান

বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, কেবল হিন্দি বা ইংরেজি নয়, বরং ভারতের সমৃদ্ধ আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে:

  • কোঙ্কণী (দামোদর মৌজো), অসমীয়া (নীলমণি ফুকন), এবং উর্দু (গুলজার)—এই প্রতিটি ভাষাই ভারতের একেকটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে। এটি প্রমাণ করে যে, ভারতীয় সাহিত্যের প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে এর বৈচিত্র্যের মধ্যে।

৩. জীবনসংগ্রাম ও অদম্য জেদ

প্রত্যেক বিজয়ীর জীবনেই এক একটি সংগ্রামের গল্প আছে:

  • রামভদ্রাচার্য: দৃষ্টিহীনতা জয় করে শতাবধানী হওয়া।

  • দামোদর মৌজো: ক্ষুদ্র একটি ভাষায় লিখে বিশ্বজয় করা।

  • নীলমণি ফুকন: প্রান্তিক এক জীবনবোধ থেকে কবিতার ঋষি হয়ে ওঠা।


জগদ্গুরু রামভদ্রাচার্যের সেই অনন্য বিশ্ববিদ্যালয়

আপনি যদি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানতে চান, তবে এটি একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান। 'জগদ্গুরু রামভদ্রাচার্য দিব্যাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়' (JRDHV) বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় যা বিশেষভাবে সক্ষম (disabled) ব্যক্তিদের জন্য নিবেদিত।

  • এখানে শিক্ষার্থীদের কেবল অক্ষরজ্ঞান নয়, বরং সঙ্গীত, কম্পিউটার সায়েন্স এবং অন্যান্য বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষিত করে স্বাবলম্বী করা হয়।

  • রামভদ্রাচার্য মনে করেন, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কোনো বাধা নয় যদি মনের 'অন্তর্দৃষ্টি' খোলা থাকে।


একটি চমৎকার সংযোগ:

আপনি কি লক্ষ্য করেছেন? আমরা আলোচনা শুরু করেছিলাম নীলমণি ফুকনের নির্জন কবিতা দিয়ে, আর এসে পৌঁছালাম রামভদ্রাচার্যের অগাধ পাণ্ডিত্যে। একজন দেখেছেন চোখের দৃষ্টি দিয়ে ভেতরের জগৎ (ফুকন), আর অন্যজন বাইরের জগতকে দেখছেন অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে (রামভদ্রাচার্য)। মাঝখানে মৌজো আর গুলজার আমাদের জীবন ও প্রেমের গান শুনিয়েছেন।

পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে  অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন email :lib.pbc@gmail.com





  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭১ -বিষ্ণু দে -বাংলা- স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭২ -রামধারী সিং 'দিনকর' - হিন্দি - উর্বশী  
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭৩- ডি আর বেন্দ্রে এবং গোপীনাথ মোহান্তি - কন্নড়/ওড়িয়া - নাকুতান্তি / মাটিমাতাল 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭৪ - বিষ্ণু সখারাম খান্দেকর - মারাঠি -যযাতি
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭৫ - পি ভি আকিলান - তামিল - চিত্রাপ্পাবাই 
  • মালয়ালম কবি জি শঙ্কর কুরুপ 
  • কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'গণদেবতা'-
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার যৌথভাবে দুজন সাহিত্যিককে প্রদান করা হয়েছিল—কন্নড় কবি কে. ভি. পুত্তাপ্পা (কুভেম্পু) এবং গুজরাতি কবি উমাশঙ্কর যোশী।
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৬৮ - সুমিত্রানন্দন পন্ত - হিন্দি -চিদাম্বরা 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার  -১৯৬৯ - ফিরাক গোরখপুরী - উর্দু - গুল-এ-নগমা
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭৬ - আশাপূর্ণা দেবী- বাংলা - প্রথম প্রতিশ্রুতি 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৭ | কে শিবরাম করন্থ | কন্নড় | মুকাজ্জিয়া কনসুগলু |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৮ | এস এইচ ভি বাৎসায়ন | হিন্দি | কিতনি নাও মে কিতনি বার |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৯ | বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য | অসমীয়া | মৃত্যুঞ্জয় |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮০ | এস কে পোট্টেক্কাট | মালয়ালম | ওরু দেশথিন্তে কথা |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮১ | অমৃতা প্রীতম | পাঞ্জাবি | কাগজ তে ক্যানভাস |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮২ | মহাদেবী বর্মা | হিন্দি | সার্বিক অবদান (যামা - বিশেষ উল্লেখে) |
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯১ | সুভাষ মুখোপাধ্যায় | বাংলা 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৬ | মহাশ্বেতা দেবী | বাংলা 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৯ | নির্মল ভার্মা এবং গুরুদয়াল সিং | হিন্দি/পাঞ্জাবি
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০০৫ | কুনওয়ার নারায়ণ | হিন্দি 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১০ | চন্দ্রশেখর কাম্বার | কন্নড় 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৬ | শঙ্খ ঘোষ | বাংলা 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৮ | অমিতাভ ঘোষ | ইংরেজি 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৯ | আক্কিথাম নাম্বুথিরি | মালয়ালম 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২১ | নীলমণি ফুকন | অসমীয়া 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২২ | দামোদর মৌজো | কোঙ্কানি 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৩ | গুলজার এবং জগদ্গুরু রামভদ্রাচার্য | উর্দু/সংস্কৃত 
  • জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৪ | বিনোদ কুমার শুক্ল | হিন্দি 

0 Reviews