Read more
জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২১ | নীলমণি ফুকন | অসমীয়া
নীলমণি ফুকন অসমীয়া সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তবে এই নামে দুজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, তাই বিভ্রান্তি এড়াতে তাঁদের পার্থক্যটি বুঝে নেওয়া জরুরি:
১. নীলমণি ফুকন (কনিষ্ঠ) — বিখ্যাত কবি
ইনিই আধুনিক অসমীয়া সাহিত্যের সবচেয়ে পরিচিত নাম এবং ৫৬তম জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (২০২১) বিজয়ী।
পরিচয়: তাঁকে 'আধুনিক অসমীয়া কবিতার ঋষি' বলা হয়। তাঁর কবিতায় প্রতীকবাদ এবং পরাবাস্তববাদের এক অনন্য মিশেল লক্ষ্য করা যায়।
বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ: 'গোলাপী জামুর লগ্ন', 'কবিতা', 'নৃত্যশালা', এবং 'সূর্য হেনো নামি আহে এই নদীয়েদি'।
পুরস্কার: জ্ঞানপীঠ ছাড়াও তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, পদ্মশ্রী (১৯৯০) এবং অসম উপত্যকা সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।
অন্যান্য গুণ: তিনি একজন বিশিষ্ট শিল্পকলা সমালোচকও ছিলেন। ২০২৩ সালে তিনি প্রয়াত হন।
২. নীলমণি ফুকন (জ্যেষ্ঠ) — বাগ্মীবর
ইনি ব্রিটিশ আমলের শেষ দিককার এবং উত্তর-স্বাধীনতা যুগের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
পরিচয়: তাঁকে 'বাগ্মীবর' বলা হয় কারণ তাঁর কথা বলার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। তিনি একাধারে রাজনৈতিক নেতা, সমাজসেবী এবং লেখক ছিলেন।
কর্মজীবন: তিনি অসম বিধানসভার সদস্য ছিলেন এবং অসমীয়া সংস্কৃতির প্রসারে বিশাল অবদান রেখেছিলেন।
অবশ্যই! বিশেষ করে জ্ঞানপীঠজয়ী নীলমণি ফুকনের (কনিষ্ঠ) কবিতা নিয়ে আলোচনা করাটা বেশ চমৎকার হবে। তাঁর কবিতা অনেকটা ক্যানভাসে আঁকা ছবির মতো—যাতে গভীর নির্জনতা এবং মনস্তাত্ত্বিক ছোঁয়া মিশে থাকে।
আপনার জন্য তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্মের কিছু বিশেষ দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
১. জীবনকাল ও পটভূমি
জন্ম: ১০ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৩ (গোলাঘাট, অসম)।
শিক্ষা ও পেশা: তিনি গুয়াহাটির আর্য বিদ্যাপীঠ কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেছেন। তবে ইতিহাস পড়াতে গিয়েও তাঁর মন পড়ে থাকতো শিল্পকলা এবং কবিতায়।
মৃত্যু: ১৯ জানুয়ারি, ২০২৩।
২. কাব্যশৈলী: কেন তিনি আলাদা?
নীলমণি ফুকনের কবিতায় জাপানি 'হাইকু' এবং ফরাসি 'প্রতীকীবাদ' (Symbolism)-এর প্রভাব স্পষ্ট। তিনি খুব কম শব্দে অনেক বড় কথা বলতে পারতেন। তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে আসতো:
অসমের প্রকৃতি ও গ্রাম্য জীবন।
মৃত্যুচেতনা এবং একাকীত্ব।
প্রাচীন লোককথা ও লোকশিল্পের ছোঁয়া।
৩. উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ
একটি ছোট পঙক্তি (অনুবাদ):
"শব্দই একমাত্র পথ, যে পথে মানুষ একাকী চলে না।"
— এটি তাঁর দর্শনের একটি মূল ভিত্তি ছিল।
আমি কবি নীলমণি ফুকনের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং গভীর ভাবার্থবহ কাব্যগ্রন্থ ‘গোলাপী জামুর লগ্ন’ সম্পর্কে আপনার সাথে কিছু কথা শেয়ার করতে পারি। এই সংকলনটি কেবল অসমীয়া সাহিত্যে নয়, ভারতীয় আধুনিক কবিতার জগতেও একটি অনন্য সংযোজন।
‘গোলাপী জামুর লগ্ন’: একটি আধ্যাত্মিক ও পরাবাস্তব জার্নি
এই কাব্যগ্রন্থের শিরোনামটিই এক আশ্চর্য রকমের চিত্রকল্প (imagery) তৈরি করে। নীলমণি ফুকন যখন এটি লিখেছিলেন, তখন তিনি শব্দকে কেবল মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং অনুভূতির বাহক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
প্রকৃতির রূপক: এখানে 'গোলাপী জামু' কোনো সাধারণ ফল নয়, এটি জীবনের একটি বিশেষ মুহূর্ত বা উপলব্ধির প্রতীক। তাঁর কবিতায় রঙের ব্যবহার (যেমন: গোলাপী) জীবনের কোমলতা এবং ক্ষণস্থায়ী সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলে।
নির্জনতা ও মৌনতা: এই সংকলনের কবিতাগুলোতে গভীর নির্জনতার সুর পাওয়া যায়। ফুকন বিশ্বাস করতেন যে, শব্দগুলোর মাঝখানের যে নীরবতা বা 'স্পেস', সেখানেই আসল কবিতা লুকিয়ে থাকে।
পরাবাস্তবতা (Surrealism): তাঁর কবিতায় আকাশ, নদী, পাখি আর পাথর এমনভাবে মিশে যায় যে মনে হয় কোনো স্বপ্নিল জগত। তিনি প্রাত্যহিক জীবনের ক্ষুদ্র বিষয়কে মহাজাগতিক রূপ দিতে পারতেন।
রাজনৈতিক আদর্শ বনাম শিল্পকলা
অন্যদিকে, বাগ্মীবর নীলমণি ফুকন (জ্যেষ্ঠ) ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্রপথিক এবং অসমীয়া জাতীয়তাবাদের একজন বড় কান্ডারি। তবে আমরা যদি কবি নীলমণি ফুকনের (কনিষ্ঠ) কথা বলি:
তিনি সরাসরি সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে না থাকলেও তাঁর লেখায় মানবিকতা এবং সামাজিক সংকট ফুটে উঠত।
অসমের অশান্ত দিনগুলোতেও তাঁর কবিতা ছিল মানুষের অন্তরের ক্ষত উপশমের মতো।
তাঁর শিল্পচেতনা ছিল দেশজ শিকড় থেকে আসা, যা পরোক্ষভাবে তাঁর গভীর দেশপ্রেমকেই প্রকাশ করে।
মজার তথ্য: নীলমণি ফুকন কেবল একজন কবিই ছিলেন না, তিনি লোকশিল্প (Folk Art) নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছিলেন। তাঁর কবিতার চিত্রকল্পগুলো অনেকটাই সেই আদিম ও সহজ লোকশিল্পের ধারা থেকে অনুপ্রাণিত।
চলুন, তাঁর কবিতার কয়েকটি লাইনের অনুবাদ এবং ফরাসি সাহিত্যের প্রভাব—এই দুটোর একটি চমৎকার মেলবন্ধন দেখা যাক। কারণ নীলমণি ফুকনের কবিতা বুঝতে হলে এই ফরাসি প্রভাবটি জানা খুব জরুরি।
ফরাসি সাহিত্যের প্রভাব ও চিত্রকল্প
নীলমণি ফুকন মূলত ফরাসি প্রতীকীবাদী (Symbolist) কবিদের দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত ছিলেন। বিশেষ করে আর্থার র্যাঁবো (Arthur Rimbaud) এবং পল ভালেরি (Paul Valéry)-র মতো কবিদের লেখা তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ফরাসি কবিরা যেমন শব্দের আড়ালে লুকানো অব্যক্ত বেদনা বা সুরকে খুঁজতেন, ফুকনও তাঁর কবিতায় তেমনটিই করতেন।
কবিতার কয়েকটি গভীর লাইন (অনুবাদ)
তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতার কিছু পঙক্তি এমন (মূল অসমীয়া থেকে ভাবার্থ):
"একটি নক্ষত্রের মৃত্যুতে পৃথিবী কতটা বদলে যায়? আকাশের কোনো এক কোণে একটি শান্ত ঘর, সেখানে কেবল জমা হয়ে থাকে অনেকগুলো শীতের রাত।"
বিশ্লেষণ: এই লাইনগুলোতে দেখা যায়, তিনি বিষাদকে বা শূন্যতাকে কোনো চিৎকার করে প্রকাশ করছেন না, বরং 'শীতের রাত' বা 'শান্ত ঘর'-এর মতো প্রতীকের মাধ্যমে একটি গভীর নির্জনতা তৈরি করছেন। এটিই তাঁর কবিতার আসল যাদু।
কেন তিনি 'চিত্রকল্পের কবি'?
ফরাসি কবিদের মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন কবিতা কেবল পড়ার জন্য নয়, দেখার জন্য।
রঙের ব্যবহার: তাঁর কবিতায় হলুদ, ধূসর বা সাদা রঙের ছড়াছড়ি থাকে।
সংক্ষিপ্ততা: ফরাসি প্রভাবের পাশাপাশি জাপানি হাইকু-র মতো তিনি অত্যন্ত অল্প কথায় একটি পুরো দৃশ্যপট এঁকে দিতে পারতেন।
আপনি কি জানেন?
নীলমণি ফুকন কেবল বিশ্ব সাহিত্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা গুহাচিত্র (Cave Paintings) এবং আদিম ভাস্কর্যের ওপরও গভীর পড়াশোনা করেছিলেন। তাঁর কবিতায় যে পাথুরে বা মাটির গন্ধ পাওয়া যায়, তা এই আদিম শিল্পের প্রতি তাঁর টান থেকেই এসেছে।
তাঁর একটি জনপ্রিয় কবিতার (অসমীয়া থেকে বাংলা) ভাবানুবাদ দেওয়া হলো:
কবিতা: পাথর
(মূল: নীলমণি ফুকন)
পাথরটি ঘুমিয়ে আছে চাঁদের আলোয়, আর তার ভেতরে একটি নদীর স্বপ্ন।
কত কাল ধরে সে অপেক্ষা করছে কেবল একটি শব্দের জন্য— যে শব্দে নদীটি জেগে উঠবে আর পাথরটি হয়ে যাবে জল।
কেন এই কবিতাটি বিশেষ?
এই ছোট্ট কবিতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে ফুকনের সেই জগৎ:
রূপক: এখানে পাথর হলো মানুষের নীরবতা বা জড়তা, আর নদী হলো প্রাণের প্রবাহ।
অপেক্ষা: কবির মতে, একটি সঠিক 'শব্দ' (কবিতা) পারে মানুষের ভেতরের সেই জড়তাকে ভেঙে প্রাণের জোয়ার আনতে।
জ্ঞানপীঠ পুরস্কারের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত (২০২১)
তাঁর কাব্যজীবনের মুকুট হয়ে এসেছিল ৫৬তম জ্ঞানপীঠ পুরস্কার। তবে এই প্রাপ্তিটি ছিল অন্যরকম:
অসমের তৃতীয় রত্ন: বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য এবং মামণি রয়সম গোস্বামীর পর তিনিই ছিলেন তৃতীয় অসমীয়া সাহিত্যিক যিনি এই সর্বোচ্চ সম্মান পান।
এক ঋষিকল্প কবি: যখন পুরস্কারের ঘোষণা আসে, কবি তখন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। গুয়াহাটির একটি অনুষ্ঠানে তাঁর বাড়িতেই আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কারটি তুলে দেওয়া হয়।
বিনয়: পুরস্কার পাওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, কবিতা তাঁর কাছে কোনো যশের বিষয় নয়, বরং এটি তাঁর বেঁচে থাকার এবং সত্যকে খোঁজার একটি পথ।
পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।। ভালো লাগলে অবশ্যই লাইক শেয়ার করুন।।লেখক : আব্দুল মুসরেফ খাঁন email :lib.pbc@gmail.com
- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭১ -বিষ্ণু দে -বাংলা- স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যত
- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭২ -রামধারী সিং 'দিনকর' - হিন্দি - উর্বশী
- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭৩- ডি আর বেন্দ্রে এবং গোপীনাথ মোহান্তি - কন্নড়/ওড়িয়া - নাকুতান্তি / মাটিমাতাল

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭৪ - বিষ্ণু সখারাম খান্দেকর - মারাঠি -যযাতি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭৫ - পি ভি আকিলান - তামিল - চিত্রাপ্পাবাই

- মালয়ালম কবি জি শঙ্কর কুরুপ

- কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস 'গণদেবতা'-

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার যৌথভাবে দুজন সাহিত্যিককে প্রদান করা হয়েছিল—কন্নড় কবি কে. ভি. পুত্তাপ্পা (কুভেম্পু) এবং গুজরাতি কবি উমাশঙ্কর যোশী।

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৬৮ - সুমিত্রানন্দন পন্ত - হিন্দি -চিদাম্বরা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৬৯ - ফিরাক গোরখপুরী - উর্দু - গুল-এ-নগমা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার -১৯৭০ - বিশ্বনাথ সত্যনারায়ণ - তেলুগু - রামায়ণ কল্পবৃক্ষমু

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার - ১৯৭৬ - আশাপূর্ণা দেবী- বাংলা - প্রথম প্রতিশ্রুতি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৭ | কে শিবরাম করন্থ | কন্নড় | মুকাজ্জিয়া কনসুগলু |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৮ | এস এইচ ভি বাৎসায়ন | হিন্দি | কিতনি নাও মে কিতনি বার |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৭৯ | বীরেন্দ্র কুমার ভট্টাচার্য | অসমীয়া | মৃত্যুঞ্জয় |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮০ | এস কে পোট্টেক্কাট | মালয়ালম | ওরু দেশথিন্তে কথা |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮১ | অমৃতা প্রীতম | পাঞ্জাবি | কাগজ তে ক্যানভাস |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৮২ | মহাদেবী বর্মা | হিন্দি | সার্বিক অবদান (যামা - বিশেষ উল্লেখে) |

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯১ | সুভাষ মুখোপাধ্যায় | বাংলা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৬ | মহাশ্বেতা দেবী | বাংলা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ১৯৯৯ | নির্মল ভার্মা এবং গুরুদয়াল সিং | হিন্দি/পাঞ্জাবি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০০৫ | কুনওয়ার নারায়ণ | হিন্দি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১০ | চন্দ্রশেখর কাম্বার | কন্নড়

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৬ | শঙ্খ ঘোষ | বাংলা

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৮ | অমিতাভ ঘোষ | ইংরেজি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০১৯ | আক্কিথাম নাম্বুথিরি | মালয়ালম

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২১ | নীলমণি ফুকন | অসমীয়া

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২২ | দামোদর মৌজো | কোঙ্কানি

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৩ | গুলজার এবং জগদ্গুরু রামভদ্রাচার্য | উর্দু/সংস্কৃত

- জ্ঞানপীঠ পুরস্কার | ২০২৪ | বিনোদ কুমার শুক্ল | হিন্দি



0 Reviews