Read more
মহাভারতের বনপর্ব যক্ষ-প্রশ্ন: বক-রূপী ধর্মরাজের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যুধিষ্ঠিরের মৃত ভাইদের প্রাণদান
মহাভারতের বনপর্বের এই উপাখ্যানটি কেবল একটি অলৌকিক কাহিনী নয়, এটি নীতিশাস্ত্র, দর্শন এবং উপস্থিত বুদ্ধির এক অনন্য নিদর্শন। পাণ্ডবদের বারো বছরের বনবাসের শেষ দিকে এই ঘটনাটি ঘটে।
তৃষ্ণার্ত ভাইদের খুঁজতে গিয়ে যুধিষ্ঠির যখন দ্বৈতবনের এক সরোবরের তীরে পৌঁছান, তিনি দেখেন তাঁর চার ভাই (ভীম, অর্জুন, নকুল ও সহদেব) মৃতপ্রায় অবস্থায় পড়ে আছেন। তখন বক-রূপী যক্ষ (যিনি প্রকৃতপক্ষে ধর্মরাজ) যুধিষ্ঠিরকে সতর্ক করে বলেন যে, তাঁর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জল পান করলে যুধিষ্ঠিরেরও একই দশা হবে।
এখানে যক্ষ ও যুধিষ্ঠিরের সেই বিখ্যাত প্রশ্নোত্তর বা 'যক্ষ-প্রশ্ন'-এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো:
শ্রেষ্ঠ প্রশ্ন ও উত্তরসমূহ
যক্ষ মোট ১২৪টি প্রশ্ন করেছিলেন। তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও গভীর কয়েকটি নিচে দেওয়া হলো:
|
যক্ষের প্রশ্ন |
যুধিষ্ঠিরের উত্তর |
|
সূর্যকে কে উদিত করেন? |
ব্রহ্মা (বা ব্রহ্মজ্ঞান)। |
|
পৃথিবীর চেয়েও ভারী কী? |
জননী (মা)। |
|
আকাশের চেয়েও উচ্চ কে? |
পিতা। |
|
বায়ুর চেয়েও দ্রুতগামী কী? |
মানুষের মন। |
|
তৃণের চেয়েও সংখ্যায় বেশি কী? |
মানুষের চিন্তা বা দুশ্চিন্তা। |
|
সেরা ধর্ম কী? |
দয়া বা আনৃশংস্য (অহিংসা)। |
|
আশ্চর্য কী? |
প্রতিদিন অগণিত প্রাণী যমালয়ে যাচ্ছে, তা দেখেও বাকিরা মনে করে তারা অমর থাকবে—এর চেয়ে আশ্চর্যের আর কিছু নেই। |
|
সুখী কে? |
যিনি ঋণী নন, প্রবাসে নেই এবং দিনে অন্তত একবার নিজের ঘরে শাক-অন্ন আহার করেন। |
যুধিষ্ঠিরের বিচক্ষণতা ও ভাইদের প্রাণদান
যুধিষ্ঠিরের উত্তরগুলোতে সন্তুষ্ট হয়ে যক্ষ তাঁকে যেকোনো একজনকে জীবিত করার বর দিতে চাইলেন। যুধিষ্ঠির তখন ভীম বা অর্জুনকে না বেছে নকুলকে জীবিত করার অনুরোধ করেন।
যক্ষ অবাক হয়ে এর কারণ জানতে চাইলে যুধিষ্ঠির অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠ উত্তর দেন:
"আমার পিতা পাণ্ডুর দুই স্ত্রী ছিলেন— কুন্তী ও মাদ্রী। আমি কুন্তীর পুত্র হিসেবে জীবিত আছি। তাই ন্যায়বিচারের খাতিরে মাদ্রীরও এক পুত্র জীবিত থাকা উচিত। তাই আমি নকুলকে বেছে নিয়েছি।"
এই নিঃস্বার্থপরতা ও সমদর্শিতা দেখে যক্ষ অত্যন্ত প্রীত হন এবং নিজের আসল পরিচয় (ধর্মরাজ) প্রকাশ করেন। তিনি কেবল নকুলকেই নয়, যুধিষ্ঠিরের বাকি তিন ভাইকেও (ভীম, অর্জুন ও সহদেব) জীবনদান করেন।
এই কাহিনীর তাৎপর্য
ধৈর্য: বিপদে অস্থির না হয়ে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করা।
ধর্ম: ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে ন্যায়বিচারকে উপরে রাখা।
জ্ঞান: প্রকৃত জ্ঞান কেবল পুঁথিতে নয়, জীবনের গভীরে থাকে।

0 Reviews