Read more
মহাভারতের বনপর্ব দুর্ভাসা মুনির পরীক্ষা: দুর্যোধনের চক্রান্তে দুর্ভাসা মুনি পাণ্ডবদের আশ্রমে এলে শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় পাণ্ডবদের রক্ষা পাওয়া
মহাভারতের বনপর্বের এই কাহিনীটি শ্রীকৃষ্ণের ভক্তবৎসল রূপ এবং পাণ্ডবদের প্রতি তাঁর অসীম করুণার এক অনন্য নিদর্শন। দুর্যোধনের কুটিল ষড়যন্ত্র কীভাবে শ্রীকৃষ্ণের চক্রে ব্যর্থ হয়েছিল, তা নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
দুর্যোধনের কুটিল পরিকল্পনা
পাণ্ডবরা তখন কাম্যক বনে বনবাস করছেন। দুর্যোধন জানতেন যে পাণ্ডবদের কাছে সূর্যদেব প্রদত্ত অলৌকিক 'অক্ষয়পাত্র' রয়েছে, যা থেকে দ্রৌপদী আহার না করা পর্যন্ত অফুরন্ত খাবার পাওয়া যায়।
দুর্ভাসা মুনি তাঁর প্রচণ্ড ক্রোধের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। দুর্যোধন একদা সেবায় তুষ্ট করে মুনির কাছে বর চাইলেন যে, মুনি যেন তাঁর দশ হাজার শিষ্যসহ পাণ্ডবদের আশ্রমে অতিথি হন। তবে শর্ত ছিল একটাই—মুনির আগমন হতে হবে দ্রৌপদীর আহার শেষ হওয়ার ঠিক পরে। দুর্যোধনের উদ্দেশ্য ছিল, দ্রৌপদীর খাওয়া হয়ে গেলে অক্ষয়পাত্রে আর অন্ন হবে না, ফলে পাণ্ডবরা মুনিকে খাওয়াতে পারবেন না এবং দুর্ভাসার অভিশাপে তাঁরা ভস্ম হয়ে যাবেন।
পাণ্ডবদের সংকট
পরিকল্পনামতো দুর্ভাসা মুনি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে মধ্যাহ্নভোজের পর পাণ্ডবদের কুটিরে উপস্থিত হলেন। যুধিষ্ঠির তাঁদের সাদর আমন্ত্রণ জানালেন। মুনিরা নদীতে স্নান ও তর্পণ করতে গেলেন। এদিকে দ্রৌপদী চিন্তায় আকুল হয়ে পড়লেন, কারণ তাঁর নিজের খাওয়া হয়ে যাওয়ায় অক্ষয়পাত্রে তখন আর এক কণাও অন্ন অবশিষ্ট ছিল না। ঋষিদের অন্নদান করতে না পারা মানেই নিশ্চিত ধ্বংস।
শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ও কৃপা
বিপদে পড়ে দ্রৌপদী মনে মনে শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করতে লাগলেন। ভক্তের ডাকে সাড়া দিয়ে শ্রীকৃষ্ণ তৎক্ষণাৎ সেখানে উপস্থিত হলেন। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তিনি পাণ্ডবদের উদ্ধার করার বদলে নিজেই বললেন যে তিনি খুব ক্ষুধার্ত!
দ্রৌপদী লজ্জিত হয়ে বললেন, "হে কৃষ্ণ, আজ আমার খাওয়া হয়ে গেছে, পাত্রে কিছুই নেই।" শ্রীকৃষ্ণ তা না শুনে অক্ষয়পাত্রটি দেখতে চাইলেন। তিনি দেখলেন পাত্রের গায়ে একটি শাকের পাতা বা কণা লেগে আছে। শ্রীকৃষ্ণ সেটি মুখে দিয়ে বললেন, "বিশ্বাত্মা ভগবান এর দ্বারা তৃপ্ত হোন।"
অলৌকিক সমাধান
শ্রীকৃষ্ণ সেই একটি কণা আহার করার সাথে সাথে এক অলৌকিক কাণ্ড ঘটল:
নদীতে স্নানরত দুর্ভাসা মুনি এবং তাঁর দশ হাজার শিষ্যের মনে হলো তাঁদের পেট কানায় কানায় ভরে গেছে।
তাঁদের এমন তৃপ্তি বোধ হলো যেন তাঁরা রাজভোগ খেয়েছেন।
মুনিরা ভয় পেয়ে গেলেন যে, তাঁরা যদি এখন আশ্রমে গিয়ে কিছু খেতে না পারেন তবে ভক্ত যুধিষ্ঠিরের অসম্মান হবে এবং সেই অপরাধে তাঁদেরই অমঙ্গল হবে।
"যস্মিন তুষ্টে জগৎ তুষ্টম্" — অর্থাৎ তিনি (কৃষ্ণ) তুষ্ট হলে সমগ্র জগৎ তুষ্ট হয়।
উপসংহার
লজ্জা ও ভয়ে দুর্ভাসা মুনি তাঁর শিষ্যদের নিয়ে সেখান থেকেই প্রস্থান করলেন। পাণ্ডবরা বিপদমুক্ত হলেন। দুর্যোধনের চক্রান্ত কেবল ব্যর্থই হলো না, বরং এটি প্রমাণ করল যে যাঁদের রক্ষাকর্তা স্বয়ং ঈশ্বর, তাঁদের কোনো পার্থিব ষড়যন্ত্রই ক্ষতি করতে পারে না।

0 Reviews