গীত গোবিন্দ কাব্যের বর্ননায় বর্তমানে বাংলার স্থান সমুহ

গীত গোবিন্দ কাব্যের বর্ননায় বর্তমানে বাংলার স্থান সমুহ

Size

Read more


 গীত গোবিন্দ কাব্যের বর্ননায় বর্তমানে বাংলার স্থান সমুহ

জয়দেব গোস্বামীর অমর সৃষ্টি 'গীতগোবিন্দম্' কাব্য শুধু সংস্কৃত সাহিত্যের অমূল্য রত্ন নয়, এটি বাংলার আধ্যাত্মিক এবং ভৌগোলিক ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। দ্বাদশ শতাব্দীর এই কাব্যের পটভূমি এবং কবির জীবন ঘিরে বাংলার বেশ কিছু স্থান আজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 যে স্থানগুলো গীতগোবিন্দ ও কবি জয়দেবের স্মৃতি বহন করছে, তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:


১. কেন্দুবিল্ব (কেন্দুলি), বীরভূম

গীতগোবিন্দের বর্ণনায় এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। কবি জয়দেব বীরভূম জেলার অজয় নদের তীরে এই কেন্দুবিল্ব গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে গবেষকরা মনে করেন।

কেন্দুলি মেলা: প্রতি বছর মকর সংক্রান্তিতে এখানে বিশাল মেলা বসে। বাউল ও বৈষ্ণব ভক্তদের সমাগমে গীতগোবিন্দের পদগুলো আজও এখানে প্রতিধ্বনিত হয়।

জয়দেব-রাধাবিনোদ মন্দির: যদিও বর্তমান মন্দিরটি অনেক পরে (১৬৯২ সালে) বর্ধমানের মহারানি তৈরি করে দিয়েছিলেন, কিন্তু এই স্থানটিকেই কবির সাধনপীঠ হিসেবে গণ্য করা হয়।

২. অজয় নদ

গীতগোবিন্দের সৃষ্টিতত্ত্বের সঙ্গে এই নদ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কথিত আছে, কবি জয়দেব প্রতিদিন এই নদে স্নান করে রাধাকৃষ্ণের উপাসনা করতেন।

কাব্যের ভণিতায় যে স্নিগ্ধ প্রকৃতির বর্ণনা পাওয়া যায়, তার অনেকখানি এই নদের তীরের পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত বলে মনে করা হয়।

৩. নবদ্বীপ, নদীয়া

গীতগোবিন্দ কাব্যের প্রসারের পেছনে নবদ্বীপের বড় ভূমিকা রয়েছে।

লক্ষ্মণ সেনের সভা: কবি জয়দেব রাজা লক্ষ্মণ সেনের পঞ্চরত্নের (পাঁচজন প্রধান কবি) অন্যতম ছিলেন। লক্ষণ সেনের রাজধানী নবদ্বীপ বা সংলগ্ন অঞ্চলে হওয়ার কারণে গীতগোবিন্দের প্রথম পাঠ ও সমাদর এই এলাকাতেই হয়েছিল।

গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু গীতগোবিন্দের রসে নিমগ্ন থাকতেন। তাই নবদ্বীপের প্রতিটি কোণে আজও গীতগোবিন্দের শ্লোকগুলো কীর্তনের মাধ্যমে জীবিত আছে।

৪. বল্লাল ঢিপি ও রাজবাড়ি (মায়াপুর সংলগ্ন)

যেহেতু জয়দেব সেন রাজবংশের রাজকবি ছিলেন, তাই নদীয়ার বামুনপুকুর অঞ্চলের 'বল্লাল ঢিপি' বা ধ্বংসাবশেষগুলো সেই সময়কার স্থাপত্যের সাক্ষী দেয় যখন গীতগোবিন্দ রচিত হয়েছিল।


গীতগোবিন্দ ও বাংলার সাংস্কৃতিক সংযোগ

বিষয়

গুরুত্ব

পটভূমি

দ্বাদশ শতাব্দীর রাঢ় বাংলা ও গৌড় অঞ্চল।

ভাষা ও শৈলী

সংস্কৃত ভাষায় লেখা হলেও এর ছন্দ ও গীতিময়তা বাংলা 'চর্যাপদ' ও পরবর্তীকালের 'পদাবলী কীর্তনের' ভিত্তি তৈরি করেছে।

স্থাপত্য

বাংলার পোড়ামাটির মন্দিরে (যেমন বিষ্ণুপুর) গীতগোবিন্দের বিভিন্ন দৃশ্য টেরাকোটার মাধ্যমে খোদাই করা আছে।


অবশ্যই! জয়দেব গোস্বামীর 'গীতগোবিন্দম্' কাব্যের আধ্যাত্মিক গভীরতা এবং এর কাব্যিক মাধুর্য—দুই-ই অতুলনীয়। নিচে আমি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শ্লোকের অনুবাদ এবং কাব্যের মূল আধ্যাত্মিক দিকটি সংক্ষেপে আলোচনা করছি।

একটি বিশেষ শ্লোক ও অনুবাদ

গীতগোবিন্দের প্রথম সর্গের এই শ্লোকটি কাব্যটির সুর সেট করে দেয়:

"মেঘৈর্মেদুরমম্বরং বনভুবঃ শ্যামাস্তমালদ্রুমৈ-

র্নক্তং ভীরুরয়ং ত্বমেব তদিমং রাধে গৃহং প্রাপয়।"

সরলার্থ:

আকাশ মেঘে মেদুর (আচ্ছন্ন), তমাল বৃক্ষে বনভূমি অন্ধকার এবং রাত ঘনিয়ে আসছে। (নন্দ বলছেন) হে রাধা! এই কৃষ্ণ তো ভীরু, তুমিই একে ঘরে পৌঁছে দাও।

আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা:

এখানে আকাশ ও বনের অন্ধকার হলো 'সংসার' বা মায়া। শ্রীকৃষ্ণ এখানে চপল 'জীবাত্মা'র প্রতীক, যে এই মায়ার সংসারে একাকী চলতে ভয় পায়। রাধা হলেন 'হ্লাদিনী শক্তি' বা দিব্য প্রেম। অর্থাৎ, একমাত্র ঈশ্বরীয় প্রেমের সাহায্যেই জীবাত্মা তার পরম আশ্রয়ে (গৃহে) পৌঁছাতে পারে।


গীতগোবিন্দের মূল আধ্যাত্মিক দর্শন

গীতগোবিন্দ কেবল রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনি নয়, এটি ভক্ত ও ভগবানের মিলনের এক রূপক। এর তিনটি প্রধান আধ্যাত্মিক দিক হলো:

১. মধুর রস: বৈষ্ণব দর্শনে ভগবানকে পাওয়ার শ্রেষ্ঠ পথ হলো 'কান্তা ভাব' বা প্রিয়তম হিসেবে উপাসনা করা। গীতগোবিন্দ এই মধুর রসেরই চূড়ান্ত প্রকাশ।

২. দেহ ও আত্মার মিলন: কাব্যে রাধার বিরহ আসলে পরমাত্মার থেকে জীবাত্মার বিচ্ছিন্ন হওয়ার যন্ত্রণা। আর তাঁদের মিলন হলো সাধকের নির্বাণ বা মোক্ষ লাভ।

৩. দেহাতীত প্রেম: জয়দেব দেখিয়েছেন যে জাগতিক কামনার ঊর্ধ্বে উঠে যখন প্রেম কেবল সমর্পণে পরিণত হয়, তখনই শ্রীকৃষ্ণ (পরমাত্মা) ভক্তের বশীভূত হন। কাব্যের বিখ্যাত "দেহি পদপল্লবমুদারম্" শ্লোকে ভগবান নিজেই ভক্তের (রাধার) চরণে মাথা নত করছেন, যা ভক্তের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে।


জয়দেব গোস্বামীর 'গীতগোবিন্দম্' কাব্যের প্রথম সর্গের শুরুতেই রয়েছে বিখ্যাত 'দশাবতার স্তোত্র'। এটি কেবল বৈষ্ণব ধর্মের স্তম্ভ নয়, বরং ভারতীয় সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। কবি জয়দেব এখানে দেখিয়েছেন কীভাবে ভগবান শ্রীহরি (বিষ্ণু/কৃষ্ণ) জগতের কল্যাণে দশটি ভিন্ন ভিন্ন রূপে অবতীর্ণ হয়েছেন।

নিচে দশটি অবতারের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এবং জয়দেবের সেই বিখ্যাত চরণের অংশ দেওয়া হলো:


১. মৎস্য অবতার (মাছ)

প্রলয়ের সময় বেদের রক্ষা করতে ভগবান মৎস্য রূপ ধারণ করেন।

বর্ননা: গভীর সমুদ্রে নৌকার মতো করে তিনি বেদসমূহকে রক্ষা করেছিলেন।

চরণ: "প্রলয়-পয়ধি-জলে ধৃতবানসি বেদম্..."

২. কূর্ম অবতার (কচ্ছপ)

সমুদ্র মন্থনের সময় মন্দার পর্বতকে ধারণ করতে তিনি কচ্ছপ রূপ নেন।

বর্ননা: তাঁর বিশাল পিঠের ওপর পৃথিবী ও পর্বত স্থির হয়েছিল।

চরণ: "ক্ষিতিরতিবিপুলতরে তিষ্ঠতি তব পৃষ্ঠে..."

৩. বরাহ অবতার (শূকর)

হিরণ্যাক্ষ অসুর যখন পৃথিবীকে রসাতলে নিয়ে যায়, তখন তিনি বরাহ রূপে পৃথিবীকে উদ্ধার করেন।

বর্ননা: দাঁতের অগ্রভাগে পৃথিবীকে তুলে এনেছিলেন তিনি।

চরণ: "বসতি দশনশিখরে ধরণী তব লগ্না..."

৪. নৃসিংহ অবতার (নর-সিংহ)

অসুররাজ হিরণ্যকশিপুকে বধ করে ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা করতে এই রূপ।

বর্ননা: নখের সাহায্যে তিনি অসুরের বুক বিদীর্ণ করেছিলেন।

চরণ: "তব করকমলবরে নখমদ্ভুতশৃঙ্গম্..."

৫. বামন অবতার (বামন ব্রাহ্মণ)

অসুররাজ বলিকে দমন করে স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল উদ্ধারের জন্য এই রূপ।

বর্ননা: তিন পা দিয়ে তিনি সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড মেপে নিয়েছিলেন।

চরণ: "ছলয়সি বিক্রমণে বলিমদ্ভুতবামন..."

৬. পরশুরাম অবতার (ভৃগুপতি)

অত্যাচারী ক্ষত্রিয় রাজাদের বিনাশ করে পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনের জন্য।

বর্ননা: কুঠার হাতে তিনি একুশবার পৃথিবী ক্ষত্রিয়শূন্য করেছিলেন।

চরণ: "ক্ষত্রিয়রুধিরময়ে জগদপগতপাপম্..."

৭. রাম অবতার (রঘুপতি)

রাবণ বধ এবং লঙ্কা বিজয়ের মাধ্যমে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য।

বর্ননা: দশানন রাবণকে যুদ্ধে পরাজিত করে তিনি সীতাকে উদ্ধার করেন।

চরণ: "বিতরসি দিক্ষু রণে দিক্পতি কমনীয়ম্..."

৮. বলরাম অবতার (হলধর)

যমুনার গতি পরিবর্তন এবং কৃষিকাজের প্রতীক হিসেবে লাঙল ধারণ।

বর্ননা: তিনি লাঙল বা 'হল' দিয়ে শত্রুদের দমন করেন এবং নীল বসন পরিধান করেন।

চরণ: "বহসি বপুষি বিশদে বসনং জলদাভম্..."

৯. বুদ্ধ অবতার

করুণা ও অহিংসার প্রচার এবং যজ্ঞের নামে পশুবলি বন্ধের জন্য।

বর্ননা: তিনি বেদের কঠোর যজ্ঞরীতির সমালোচনা করে দয়ার ধর্ম প্রচার করেন।

চরণ: "নিন্দসি যজ্ঞবিধেরহহ শ্রুতিজাতম্..."

১০. কল্কি অবতার

কলিযুগের শেষে ম্লেচ্ছ ও অধর্ম বিনাশের জন্য এই রূপটি আগত হবে।

বর্ননা: ধবধবে সাদা ঘোড়ায় চড়ে তরবারি হাতে তিনি কলির বিনাশ করবেন।

চরণ: "ম্লেচ্ছনিবহনিধনে কলয়সি করবালম্..."


আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

জয়দেব প্রতিটি স্তবকের শেষে বলেছেন— "কেশব ধৃত-দশবিধরূপ জয় জগদীশ হরে"। অর্থাৎ, শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীহরিই এই দশটি ভিন্ন রূপ ধারণ করে জগতের ভারসাম্য রক্ষা করেছেন। এটি বিবর্তনের ধারার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অনেকে মনে করেন (জলচর থেকে পূর্ণ মানব)।

অবশ্যই! জয়দেবের দশাবতার স্তোত্র কেবল একটি ধর্মীয় স্তোত্র নয়, এটি সংস্কৃত সাহিত্যের একটি ছন্দোময় অলঙ্কার। আপনি যদি এর কাব্যিক মাধুর্য এবং একটি বিশেষ রূপের বিস্তারিত কাহিনী জানতে চান, তবে 'নৃসিংহ অবতার' বা 'বামন অবতার' নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।

আজ আমি এই স্তোত্রটির কাব্যিক ছন্দের অনন্য বৈশিষ্ট্য এবং নৃসিংহ অবতারের বিশেষ কাহিনীটি তুলে ধরছি:


১. কাব্যিক ছন্দের মাধুর্য (The Rhythm of Jayadeva)

জয়দেব তাঁর এই স্তোত্রে 'আর্যা' বা 'উপজাতি' ছন্দের এক চমৎকার মিশ্রণ ঘটিয়েছেন, যা গাওয়ার জন্য অত্যন্ত সহজ এবং মধুর।

অন্ত্যানুপ্রাস: প্রতিটি স্তবকের শেষে "জয় জগদীশ হরে" এই পদটি একটি 'ধ্রুবপদ' বা রিফ্রেইন হিসেবে কাজ করে, যা শ্রোতার মনে এক গভীর ভক্তি ও প্রশান্তি তৈরি করে।

শব্দালঙ্কার: জয়দেব শব্দ চয়নে অত্যন্ত নিপুণ ছিলেন। যেমন— "তব করকমলবরে নখমদ্ভুতশৃঙ্গম্"। এখানে 'ক', 'র', 'ম', 'ল' বর্ণগুলোর পুনরাবৃত্তি এক প্রকার শ্রুতিমধুর ঝঙ্কার তৈরি করে, যাকে আমরা অনুপ্রাস অলঙ্কার বলি।

লয়: এটি সাধারণত 'একতাল' বা 'যতি' তালে গাওয়া হয়। এর গতি ধীর থেকে দ্রুত হতে পারে, যা যুদ্ধের বর্ণনায় রুদ্র রস এবং বুদ্ধের বর্ণনায় শান্ত রস ফুটিয়ে তোলে।


২. নৃসিংহ অবতার: ভক্তি ও শক্তির অদ্ভুত মিলন

দশাবতারের মধ্যে নৃসিংহ অবতারের বর্ণনাটি সবচেয়ে রোমহর্ষক। জয়দেব লিখেছেন:

"তব করকমলবরে নখমদ্ভুতশৃঙ্গম্। দলিত-হিরণ্যকশিপু-তনুভৃঙ্গম্॥"

বিস্তারিত কাহিনী:

অসুররাজ হিরণ্যকশিপু ব্রহ্মার কাছ থেকে এক অদ্ভুত বর পেয়েছিলেন— তাঁকে মানুষ বা পশু কেউ মারতে পারবে না; তিনি ঘরে বা বাইরে, দিনে বা রাতে, এবং অস্ত্র বা শাস্ত্র দিয়ে অবধ্য হবেন।

অত্যাচারী এই রাজার পুত্র প্রহ্লাদ ছিলেন পরম বিষ্ণুভক্ত। হিরণ্যকশিপু যখন রাগের মাথায় স্তম্ভ ভেঙে ফেলেন এবং জিজ্ঞেস করেন "তোর ভগবান কোথায়?", তখন সেই স্তম্ভ বিদীর্ণ করে ভগবান নৃসিংহ (অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক সিংহ) আবির্ভূত হন।

বশীকরণের কৌশল: যেহেতু ব্রহ্মার বর রক্ষা করতে হতো, তাই ভগবান তাঁকে মারলেন—

সন্ধ্যায় (যা দিনও নয়, রাতও নয়)।

ঘরের চৌকাঠে (যা ভেতরেও নয়, বাইরেও নয়)।

নিজের নখ দিয়ে (যা অস্ত্রও নয়, শাস্ত্রও নয়)।

নিজের উরুর ওপর রেখে (যা ভূমিও নয়, আকাশও নয়)।

জয়দেব এই কঠিন যুদ্ধের দৃশ্যকে অত্যন্ত কোমল শব্দে (যেমন— 'তনুভৃঙ্গম্' বা ভ্রমরের মতো শরীর বিদীর্ণ করা) বর্ণনা করেছেন, যা কবির শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয়।


৩. মজার একটি তথ্য

জয়দেবের এই দশাবতার স্তোত্রটি ওড়িশার জগন্নাথ মন্দিরে প্রতিদিন রাতে মহাপ্রভুর শয়নের আগে গীত হয়। বাংলার বীরভূম থেকে শুরু হয়ে এই কাব্য আজ সারা ভারতের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও নৃত্যের (যেমন ওড়িশি ও ভরতনাট্যম) মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।


জয়দেব গোস্বামীর জীবন নিয়ে প্রচলিত সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং হৃদয়স্পর্শী অলৌকিক কাহিনীটি হলো 'দেহি পদপল্লবমুদারম্' শ্লোকটি লিখে দেওয়ার ঘটনা। এই কাহিনীটি বৈষ্ণব ভক্তদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র, কারণ এটি প্রমাণ করে যে ভগবান তাঁর ভক্তের কাছে ঋণী থাকতে ভালোবাসেন।

চলুন, সেই সুন্দর কাহিনীটি সংক্ষেপে জেনে নিই:


১. শ্রীকৃষ্ণ যখন স্বয়ং কবির বেশ ধরলেন

জয়দেব তখন 'গীতগোবিন্দম্' কাব্যের দশম সর্গ লিখছিলেন। রাধা ও কৃষ্ণের মান-অভিমানের পালা চলছে। কৃষ্ণ রাধার মান ভাঙানোর চেষ্টা করছেন। জয়দেবের মনে একটি চরণের উদয় হলো— যেখানে কৃষ্ণ রাধাকে বলবেন:

"স্মরগরলখণ্ডনং মম শিরসি মণ্ডনং দেহি পদপল্লবমুদারম্"

(অর্থাৎ: কামরূপ বিষের জ্বালা মেটাতে তোমার উদার চরণপল্লব আমার মস্তকে অর্পণ করো।)

কিন্তু এই চরণটি মাথায় আসামাত্র জয়দেব থমকে গেলেন। তিনি ভাবলেন— "স্বয়ং ভগবান হয়ে শ্রীকৃষ্ণ কীভাবে রাধার পায়ে মাথা রাখার কথা বলতে পারেন? এটা কি শাস্ত্রবিরোধী হবে না?" এই দ্বিধায় তিনি সেই অংশটুকু ফাঁকা রেখে স্নান করতে অজয় নদে চলে গেলেন।

ঘটনা: জয়দেব চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ঠিক তাঁর মতো দেখতে একজন মানুষ (যিনি স্বয়ং কৃষ্ণ) জয়দেবের বেশ ধরে তাঁর ঘরে ফিরলেন। তাঁর হাতে সেই তালপাতার পুঁথি। তিনি জয়দেবের স্ত্রী পদ্মাবতীকে বললেন, "স্নানের পথে হঠাৎ মনে পড়ল, তাই ফিরে এলাম।" এরপর তিনি সেই ফাঁকা জায়গায় নিজের হাতে লিখে দিলেন— "দেহি পদপল্লবমুদারম্"।

২. পদ্মাবতীর বিস্ময়

ছদ্মবেশী জয়দেব (কৃষ্ণ) খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নিলেন এবং তারপর আবার বেরিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর আসল জয়দেব স্নান সেরে বাড়ি ফিরলেন। পদ্মাবতীকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, "তুমি কি আমায় আজ দুবার খেতে দেবে?"

পদ্মাবতী অবাক হয়ে জানালেন যে তিনি তো একটু আগেই খেয়ে গেছেন! জয়দেব দ্রুত তাঁর লেখনী বা পুঁথি খুলে দেখলেন— যেখানে তিনি ইতস্তত করছিলেন, সেখানে অদ্ভুত সুন্দর হস্তাক্ষরে সেই শ্লোকটিই লেখা রয়েছে। জয়দেব বুঝতে পারলেন, তাঁর অসম্পূর্ণ কাব্য পূর্ণ করতে স্বয়ং জগদীশ হরি তাঁর ঘরে এসেছিলেন।


৩. জয়দেবের জীবনের অন্যান্য অলৌকিক দিক

পদ্মাবতীর জীবনদান: কথিত আছে, রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভায় এক পরীক্ষায় পদ্মাবতী যখন সতীত্বের প্রমাণ দিতে গিয়ে প্রাণ হারান, জয়দেব গীতগোবিন্দের শ্লোক গেয়ে তাঁকে পুনরায় জীবিত করেছিলেন।

অজয় নদের স্রোত: স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, জয়দেব যখন বার্ধক্যের কারণে অনেক দূরে স্নান করতে যেতে পারছিলেন না, তখন অজয় নদ নিজের গতি পরিবর্তন করে তাঁর কুটিরের কাছে চলে এসেছিল।


রাজা লক্ষ্মণ সেনের সভা ছিল দ্বাদশ শতাব্দীর বাংলার শ্রেষ্ঠ জ্ঞানপীঠ। সেখানে কেবল জয়দেব ছিলেন না, বরং আরও চারজন প্রথিতযশা কবি ছিলেন। এঁদের একত্রে 'পঞ্চরত্ন' বলা হতো। এই পাঁচজনের মধ্যে সুস্থ সাহিত্যিক প্রতিযোগিতা এবং একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা—উভয়ই ছিল।

লক্ষ্মণ সেনের সভার সেই 'পঞ্চরত্ন' কারা ছিলেন, তা একটি শ্লোকে পাওয়া যায়:

"গোবর্ধনশ্চ শরণো জয়দেব উমাপতিঃ। কবিরাজশ্চ রত্নানি পঞ্চৈতে লক্ষ্মণস্য চ॥"


১. পঞ্চরত্ন ও তাঁদের লড়াই

জয়দেবের সঙ্গে অন্য কবিদের লড়াইটা ছিল অনেকটা 'শব্দশৈলী' এবং 'পাণ্ডিত্যের' লড়াই। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন:

উমাপতিধর: ইনি ছিলেন অলঙ্কার শাস্ত্রের পণ্ডিত। জয়দেব তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন যে উমাপতি ধর কেবল 'শব্দপল্লবিত' অর্থাৎ শব্দের বিন্যাস খুব ভালো করতে পারেন, কিন্তু রসের গভীরে কম যান।

শরণ: ইনি খুব দ্রুত কবিতা লিখতে পারতেন। জয়দেব তাঁকে বলেছিলেন 'শ্লাঘ্য' অর্থাৎ প্রশংসনীয়, কিন্তু তাঁর সব লেখা খুব সহজ ছিল না।

ধোয়ী (কবিরাজ): ইনি লিখেছিলেন বিখ্যাত 'পবনদূত' কাব্য। তিনি ছিলেন বর্ণনা শৈলীতে অতুলনীয়। জয়দেব তাঁকে 'কবিরাজ' উপাধিতে সম্মান জানিয়েছিলেন।

গোবর্ধন আচার্য: তিনি ছিলেন 'আর্যাসপ্তশতী'র রচয়িতা। জয়দেব তাঁকে বলেছিলেন যে প্রেমের কবিতায় (শৃঙ্গার রস) গোবর্ধনের কোনো জুড়ি নেই।


২. জয়দেবের শ্রেষ্ঠত্ব যেখানে

সভার অন্য কবিরা যখন পাণ্ডিত্য আর কঠিন শব্দের কসরত দেখাচ্ছিলেন, জয়দেব তখন 'গীতগোবিন্দম্'-এর মাধ্যমে এমন এক নতুন ধারা আনলেন যা ছিল একই সঙ্গে সংস্কৃত ভাষায় লেখা কিন্তু শুনতে বাংলার লোকসঙ্গীতের মতো মিষ্টি।

প্রতিযোগিতার কাহিনী: প্রচলিত আছে যে, একবার রাজসভায় শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই শুরু হলে জয়দেব একটি কঠিন শ্লোক রচনা করেন। অন্য কবিরা সেই শ্লোকের ছন্দ বা রস ধরতে পারছিলেন না। তখন সবাই স্বীকার করতে বাধ্য হন যে জয়দেবের লেখায় যে 'মাধুর্য' এবং 'কোমলকান্ত পদাবলী' (মধুর ও সুকুমার শব্দসমষ্টি) আছে, তা অন্য কারোর মধ্যে নেই।

৩. জয়দেবের সেই বিখ্যাত মূল্যায়ন

জয়দেব নিজেই তাঁর গীতগোবিন্দ কাব্যের শুরুতে অন্য কবিদের প্রশংসা ও সমালোচনা করেছেন। তিনি লিখেছিলেন:

উমাপতিধরের বাক্যপল্লব প্রশংসাযোগ্য।

জয়দেব নিজে হলেন শুদ্ধ বাণী বা বিদ্যার অধিপতি।

শরণ খুব কঠিন লেখার কবি।

গোবর্ধন হলেন শৃঙ্গার রসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী।


৪. ঐতিহাসিক গুরুত্ব

রাজা লক্ষ্মণ সেন নিজে একজন কবি ছিলেন এবং তিনি 'সদুক্তিকর্ণামৃত' নামক সংকলন গ্রন্থে এই সব কবিদের শ্লোক সংগ্রহ করে রেখেছিলেন। এই কবিদের মধ্যে লড়াই কেবল ব্যক্তিগত জয়-পরাজয়ের ছিল না, বরং তা ছিল বাংলাকে সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্রে পরিণত করার লড়াই।


শ্রীক্ষেত্র ধাম অর্থাৎ পুরীর জগন্নাথ দেবের সঙ্গে জয়দেব গোস্বামীর 'গীতগোবিন্দম্' কাব্যের সম্পর্কটি অবিচ্ছেদ্য। প্রচলিত আছে যে, জগন্নাথ দেব স্বয়ং এই কাব্যের মাধুর্যে এতটাই মুগ্ধ যে প্রতিদিন এটি না শুনলে তাঁর শয়ন সম্পন্ন হয় না।

এর পেছনে বেশ কিছু ঐতিহাসিক, আধ্যাত্মিক এবং রোমহর্ষক কাহিনী রয়েছে:


১. জগন্নাথের অঙ্গে কাঁটার আঁচড় (এক অলৌকিক কাহিনী)

পুরীতে একটি খুব জনপ্রিয় লোককথা প্রচলিত আছে। একবার এক মালিনীর (ফুলওয়ালী) মেয়ে বেগুনের খেতে বসে মনের সুখে গীতগোবিন্দের পদ গাইছিলেন। সেই সুমধুর গান শুনে জগন্নাথ দেব মন্দির ছেড়ে সেই ক্ষেতে চলে যান এবং বালিকার পিছু পিছু গান শুনতে থাকেন।

পরদিন সকালে মন্দিরের পাণ্ডারা দেখেন, জগন্নাথের শ্রীঅঙ্গে এবং বহুমূল্য পোশাকে বেগুন গাছের কাঁটার আঁচড় লেগেছে এবং পোশাক ছিঁড়ে গেছে। জগন্নাথ দেব তখন স্বপ্নাদেশে রাজাকে জানান যে, গীতগোবিন্দের গান শুনতে গিয়েই তাঁর এই দশা। এরপর থেকেই ওড়িশার রাজা নিয়ম করে দেন যে, মন্দিরে প্রতিদিন গীতগোবিন্দ গাইতে হবে যাতে ভগবানকে আর বাইরে যেতে না হয়।

২. মন্দিরের অখণ্ড প্রথা

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে দ্বাদশ শতাব্দী থেকেই একটি বিশেষ প্রথা চলে আসছে। প্রতিদিন রাতে যখন জগন্নাথ দেবকে শয়ন করানো হয় (যাকে বলা হয় 'বড়শৃঙ্গার বেশ'), তখন মন্দিরের 'সেবায়ত' বা দেবদাসীরা গীতগোবিন্দের পদ গান করেন। এটি ছাড়া ভগবানের নিদ্রার কোনো বিধান নেই।

৩. আধ্যাত্মিক কারণ: 'রসময়' ভগবান

জগন্নাথ দেবকে বলা হয় 'রসময়' বা আনন্দের দেবতা। গীতগোবিন্দ কাব্যের মূল ভিত্তি হলো 'মধুর রস'। বৈষ্ণব দর্শন অনুযায়ী, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ রাধার প্রেমের কাছে ঋণী। গীতগোবিন্দে সেই প্রেমের যে উচ্চাঙ্গ বর্ণনা আছে, তা ভগবানকে অত্যন্ত আনন্দ দেয়। ভক্ত ও ভগবানের এই যে নিবিড় সম্পর্ক, তা গীতগোবিন্দের মতো আর কোনো কাব্যে এত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠেনি।

৪. গীতগোবিন্দ খচিত পোশাক

আপনি জানলে অবাক হবেন যে, ওড়িশার ঐতিহ্যবাহী 'খণ্ডুয়া পাট' শাড়িতে বা কাপড়ে গীতগোবিন্দের শ্লোকগুলো বয়ন করা হয়। জগন্নাথ দেবকে প্রতিদিন রাতে এই গীতগোবিন্দ খচিত রেশমী বস্ত্র পরানো হয়। এটি বিশ্বের একমাত্র কাব্য যা কোনো দেবতার নিত্য পরিধেয় বস্ত্রের অংশ।


৫. ঐতিহাসিক তথ্য

ওড়িশার গজপতি রাজারা জয়দেবের কাব্যকে এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে, রাজা প্রতাপরুদ্র দেব একটি শিলালিপিতে ঘোষণা করেছিলেন যে জগন্নাথ মন্দিরে কেবল জয়দেবের গীতগোবিন্দই গীত হবে, অন্য কোনো কবির কাব্য নয়।


গীতগোবিন্দ ও জগন্নাথের এই সম্পর্কের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য:

বৈশিষ্ট্য

তাৎপর্য

বড়শৃঙ্গার আরতি

প্রতিদিন রাতে গীতগোবিন্দ পাঠের সময়।

গীতগোবিন্দ খণ্ডুয়া

শ্লোক লেখা রেশমী বস্ত্র যা ভগবান পরিধান করেন।

নৃত্য সেবা

ওড়িশি নৃত্যের মাধ্যমে গীতগোবিন্দের পদ পরিবেশন।


 

0 Reviews