Read more
আল-কুরআন: এক সংক্ষিপ্ত পরিচয়
আল-কুরআন কেবল একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, বরং এটি মুসলিমদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। নিচে আল-কুরআন সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত ও বর্ণনামূলক আলোচনা দেওয়া হলো:
১. পরিচয় ও অবতরণ
আল-কুরআন মহান আল্লাহ তাআলার বাণী, যা শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। এটি আরবি ভাষায় নাজিলকৃত এবং কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক।
২. গঠনশৈলী
কুরআনের গঠন অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং অলৌকিক। এর প্রধান অংশগুলো হলো:
পারা: পবিত্র কুরআন মোট ৩০টি পারায় (অংশ) বিভক্ত।
সূরা: এতে মোট ১১৪টি সূরা রয়েছে।
আয়াত: এতে প্রায় ৬,৬৬৬টি (মতভেদে কিছুটা কম-বেশি) আয়াত রয়েছে।
মক্কী ও মাদানী সূরা: হিজরতের আগে নাজিল হওয়া সূরাগুলোকে 'মক্কী' এবং পরে নাজিল হওয়া সূরাগুলোকে 'মাদানী' বলা হয়।
৩. মূল বিষয়বস্তু
কুরআনের মূল লক্ষ্য হলো মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে আনা। এর প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলো হলো:
তাওহীদ: আল্লাহর একত্ববাদ এবং তাঁর গুণাবলি।
রিসালাত: নবী-রাসূলদের কাহিনী ও তাঁদের দাওয়াত।
আখিরাত: পরকাল, জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা।
আইন ও বিধান: পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা।
বিজ্ঞান ও প্রকৃতি: সৃষ্টিজগত সম্পর্কে অসংখ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য যা আধুনিক বিজ্ঞানকেও বিস্মিত করে।
৪. সংরক্ষণের অলৌকিকত্ব
পৃথিবীর একমাত্র গ্রন্থ যা কোটি কোটি মানুষ অবিকল মুখস্থ (হিফজ) করে রেখেছেন। আল্লাহ নিজেই এই গ্রন্থ সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন, যার ফলে গত ১৪০০ বছরে এর একটি অক্ষরও পরিবর্তিত হয়নি।
কুরআনের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য:
|
বৈশিষ্ট্য |
বিবরণ |
|
ভাষা |
উচ্চমানসম্পন্ন ও কাব্যিক আরবি যা মানুষের পক্ষে রচনা করা অসম্ভব। |
|
নাম |
'কুরআন' শব্দের অর্থ 'যা বারবার পঠিত হয়'। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পঠিত বই। |
|
উপদেশ |
এটি মুমিনদের জন্য রহমত এবং অন্তরের রোগের শেফা (নিরাময়)। |
মূল কথা: আল-কুরআন মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল সমস্যার সমাধান দেয়। এটি কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং বুঝে আমল করার জন্য।
আল-কুরআনের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের সামঞ্জস্য
আল-কুরআনের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের সামঞ্জস্য সত্যিই বিস্ময়কর। ১৪০০ বছর আগে এমন সব বৈজ্ঞানিক তথ্য কুরআনে দেওয়া হয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞান মাত্র কয়েক দশক আগে আবিষ্কার করেছে। নিচে কয়েকটি প্রধান বৈজ্ঞানিক অলৌকিকত্ব আলোচনা করা হলো:
১. মহাবিশ্বের সৃষ্টি (বিগ ব্যাং থিওরি)
আধুনিক বিজ্ঞান বলে মহাবিশ্ব একটি বিন্দু থেকে বিস্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
"যারা কুফরী করে তারা কি দেখে না যে, আসমানসমূহ ও জমিন পরস্পর মিশে ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম?" (সূরা আম্বিয়া: ৩০)
২. ভ্রূণতত্ত্ব (Embryology)
মায়ের গর্ভে একটি শিশু কীভাবে ধাপে ধাপে বড় হয়, তা কুরআনে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। অথচ তখন কোনো আল্ট্রাসনোগ্রাফি বা মাইক্রোস্কোপ ছিল না।
জোকের মতো ঝুলে থাকা (Alakah): ভ্রূণ যখন জরায়ুতে থাকে, তখন এটি দেখতে অনেকটা জোকের (Leech) মতো। কুরআন এই অবস্থাকে বলেছে 'আলাকাহ'।
হাড় ও মাংসের গঠন: প্রথমে হাড় তৈরি হয়, তারপর তার ওপর মাংসের আবরণ দেওয়া হয় (সূরা মুমিনুন: ১৪)।
৩. প্রসারমান মহাবিশ্ব (Expanding Universe)
বিংশ শতাব্দীতে স্টিফেন হকিং এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে মহাবিশ্ব ক্রমাগত বড় হচ্ছে। কুরআনে এটি স্পষ্ট করে বলা হয়েছে:
"আমি স্বীয় ক্ষমতাবলে আকাশ নির্মাণ করেছি এবং আমি অবশ্যই এর বিস্তারকারী।" (সূরা আয-যারিয়াত: ৪৭)
৪. পর্বতমালা ও ভূ-তত্ত্ব
ভূ-বিজ্ঞানীদের মতে, পাহাড়গুলো মাটির নিচে পেরেকের মতো গেঁথে থাকে এবং পৃথিবীকে ভূমিকম্প বা নড়াচড়া থেকে রক্ষা করে (Isostasy)। কুরআন বলছে:
"আমি কি জমিনকে বিছানা এবং পাহাড়গুলোকে পেরেক স্বরূপ বানাইনি?" (সূরা আন-নাবা: ৬-৭)
৫. সমুদ্রের পানি মিশ্রিত না হওয়া
দুটি ভিন্ন লোনা ও মিষ্টি পানির সমুদ্র যখন মিলিত হয়, তাদের মাঝে একটি অদৃশ্য পর্দা থাকে যা পানিকে মিশতে দেয় না। এটি আধুনিক মহাসমুদ্র বিজ্ঞানের একটি বড় আবিষ্কার।
"তিনি পাশাপাশি দুই সমুদ্র প্রবাহিত করেছেন... উভয়ের মাঝখানে রয়েছে এক অন্তরাল যা তারা অতিক্রম করতে পারে না।" (সূরা আর-রহমান: ১৯-২০)
কুরআনের বিজ্ঞানের আরও কিছু সংকেত:
|
ক্ষেত্র |
কুরআনের তথ্য |
বৈজ্ঞানিক সত্য |
|
জ্যোতির্বিজ্ঞান |
সূর্যের নিজস্ব কক্ষপথ আছে (সূরা আম্বিয়া: ৩৩) |
সূর্য তার নির্দিষ্ট কক্ষপথে আবর্তন করছে। |
|
উদ্ভিদবিজ্ঞান |
প্রতিটি গাছপালা জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্ট (সূরা ত্বহা: ৫৩) |
উদ্ভিদেরও পুরুষ ও স্ত্রী লিঙ্গ রয়েছে। |
|
লোহা |
লোহা আকাশ থেকে 'নাজিল' বা প্রেরিত হয়েছে। |
লোহা পৃথিবীতে তৈরি হয়নি, এটি উল্কাপাতের মাধ্যমে মহাকাশ থেকে এসেছে। |
বড় কথা হলো: কুরআন কোনো বিজ্ঞানের বই নয়, এটি একটি 'নিদর্শন' বা 'আয়াতের' বই। তবে এর প্রতিটি বক্তব্য আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আল-কুরআনে ভ্রূণতত্ত্ব (Embryology) এবং মহাকাশ বিজ্ঞান (Astronomy) নিয়ে যে বর্ণনা রয়েছে, তা আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে তুলনা করলে যে কেউ বিস্মিত হতে বাধ্য। নিচে এই দুটি বিষয় গভীরভাবে আলোচনা করা হলো:
১. ভ্রূণতত্ত্ব (Embryology): মাতৃগর্ভে প্রাণের বিকাশ
কুরআনে ভ্রূণের বিকাশের পর্যায়গুলো এত সূক্ষ্মভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, প্রখ্যাত ভ্রূণতত্ত্ববিদ ড. কিথ এল. মুর (Keith L. Moore) এগুলো দেখে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
কুরআনের বর্ণনা (সূরা আল-মুমিনুন: ১২-১৪):
"আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির সারাংশ থেকে। অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দু রূপে এক সংরক্ষিত আধারে (জরায়ু) স্থাপন করি। এরপর শুক্রবিন্দুকে আলাকাহ (জোঁকের মতো ঝুলে থাকা বস্তু) এ পরিণত করি, অতঃপর 'আলাকাহ'কে মুদগাহ (চিবানো গোশত) এ পরিণত করি, অতঃপর 'মুদগাহ' থেকে হাড় তৈরি করি এবং হাড়কে মাংস দ্বারা আবৃত করি..."
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:
আলাকাহ (Alakah): এই পর্যায়ে ভ্রূণ জরায়ুর দেয়ালে ঝুলে থাকে এবং দেখতে হুবহু একটি জোঁকের মতো। আধুনিক মাইক্রোস্কোপে এটি প্রমাণিত।
মুদগাহ (Mudgah): ভ্রূণের এই পর্যায়ে তাতে দাঁতের দাগের মতো খাঁজ তৈরি হয়, যা দেখতে অনেকটা 'চিবানো গোশতের' টুকরোর মতো লাগে।
হাড় ও মাংস: বিজ্ঞানের মতে, ভ্রূণে প্রথমে তরুণাস্থি বা হাড়ের কাঠামো তৈরি হয় এবং তার পরেই পেশি বা মাংস দ্বারা তা আবৃত হয়।
২. মহাকাশ বিজ্ঞান (Astronomy): সৃষ্টি ও স্থিতি
মহাকাশ নিয়ে কুরআনের আয়াতগুলো মহাবিশ্বের বিশালত্ব এবং নিয়মশৃঙ্খলার প্রমাণ দেয়।
ক. মহাবিশ্বের কক্ষপথ
মানুষ একসময় ভাবত পৃথিবী স্থির এবং সূর্য ঘোরে। পরে ভাবা হতো সূর্য স্থির। কিন্তু কুরআন ১৪০০ বছর আগে বলেছে:
"তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং সূর্য ও চাঁদ; সবাই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করছে।" (সূরা আম্বিয়া: ৩৩)
বিজ্ঞান: আজ আমরা জানি সূর্য শুধু স্থির নয়, বরং এটি তার নিজস্ব কক্ষপথে (Solar Apex) ঘণ্টায় প্রায় ৭ লক্ষ কিলোমিটার বেগে ছুটছে।
খ. আকাশ একটি 'সুরক্ষিত ছাদ'
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল আমাদের মহাকাশের ক্ষতিকর রশ্মি (যেমন: গামা রে, এক্স-রে) এবং উল্কাপাত থেকে রক্ষা করে। কুরআন বলছে:
"আমি আকাশকে একটি সুরক্ষিত ছাদ করেছি, অথচ তারা এর নিদর্শনাবলী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।" (সূরা আম্বিয়া: ৩২)
গ. ধোঁয়া থেকে সৃষ্টি (Primordial Gas)
মহাবিশ্ব সৃষ্টির শুরুতে এটি একটি গ্যাসীয় পিন্ড বা ধোঁয়া ছিল। কুরআন বলছে:
"অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোযোগ দিলেন যা ছিল ধোঁয়া (দুখান)..." (সূরা ফুসসিলাত: ১১)
বিজ্ঞান: আধুনিক কসমোলজি অনুযায়ী, নক্ষত্র সৃষ্টির আগে মহাবিশ্ব ছিল গরম গ্যাস বা 'Nebula' দ্বারা পূর্ণ।
কুরআনের বিশেষ কিছু বৈজ্ঞানিক শব্দ:
|
শব্দ |
কুরআনিক অর্থ |
আধুনিক বৈজ্ঞানিক সামঞ্জস্য |
|
তারিক (Tariq) |
রাতে আগন্তুক / করাঘাতকারী |
Pulsars: মহাকাশের এমন নক্ষত্র যা নিয়মিত বিরতিতে রেডিও পালস বা শব্দের মতো সংকেত দেয়। |
|
ছিদ্রহীন আকাশ |
সুবিন্যস্ত বায়ুমণ্ডল |
ওজোন স্তর ও ভ্যান অ্যালেন বেল্ট যা পৃথিবীকে সুরক্ষা দেয়। |
|
অন্ধকার স্তর |
তিন স্তরের অন্ধকার |
জরায়ুর তিনটি স্তর (পেট, জরায়ু দেয়াল, এমনিওটিক পর্দা)। |
উপসংহার:
কুরআন কোনো ল্যাবরেটরিতে বসে লেখা হয়নি, বরং এটি সেই সত্তার বাণী যিনি এই মহাবিশ্ব ও মানবদেহ সৃষ্টি করেছেন। তাই বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কার কেবল কুরআনের সত্যতাকেই বারবার প্রমাণ করে।
মহাসমুদ্রের গভীরতা এবং পাহাড়ের গঠন নিয়ে কুরআনে বর্ণনা
মহাসমুদ্রের গভীরতা এবং পাহাড়ের গঠন নিয়ে কুরআনে যে বর্ণনা রয়েছে, তা আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞান (Oceanography) ও ভূ-তত্ত্বের (Geology) সাথে অবিশ্বাস্যভাবে মিলে যায়। নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. মহাসমুদ্রের গভীরতা ও অন্ধকার (Deep Seas and Internal Waves)
প্রাচীনকালে মানুষ মনে করত সাগরের নিচে কেবল অন্ধকার থাকে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, গভীর সমুদ্রে আলোর অভাব ছাড়াও সেখানে বিশাল 'অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ' (Internal Waves) থাকে।
কুরআনের বর্ণনা (সূরা আন-নূর: ৪০):
"অথবা (তাদের কর্ম) প্রমত্ত সমুদ্রের গভীর অন্ধকারের মতো, যাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ, যার ওপরে রয়েছে মেঘপুঞ্জ। একের ওপর এক অন্ধকার..."
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:
তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ: সমুদ্রবিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে, গভীর সমুদ্রে দুই ধরনের ঢেউ থাকে। একটি উপরিভাগের ঢেউ (যা আমরা দেখি), আর অন্যটি সমুদ্রের নিচের স্তরে থাকা অভ্যন্তরীণ ঢেউ। কুরআন স্পষ্টভাবে 'তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ' বলে এই দুটি স্তরের কথা ইঙ্গিত করেছে।
স্তরভিত্তিক অন্ধকার: সমুদ্রের ২০০ মিটার পর থেকে আলো কমতে থাকে এবং ১০০০ মিটারের নিচে গেলে সম্পূর্ণ অন্ধকার। সেখানে স্তরে স্তরে সাতটি রঙের আলো শোষিত হয়ে যায়। এই 'একের ওপর এক অন্ধকার'-এর কথা আজ আধুনিক ডাইভিং সরঞ্জাম ছাড়া জানা সম্ভব হতো না।
২. পাহাড়ের কাজ: পেরেকের মতো স্থিতি (Mountains as Pegs)
সাধারণত আমরা পাহাড়কে মাটির ওপরে কেবল উঁচু ঢিবি হিসেবে দেখি। কিন্তু ভূ-তত্ত্ববিদরা জানিয়েছেন, পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ মাটির নিচে মূল বা পেরেকের মতো গেঁথে থাকে।
কুরআনের বর্ণনা (সূরা আন-নাবা: ৬-৭):
"আমি কি জমিনকে বিছানা এবং পাহাড়গুলোকে পেরেক (আওতাদ) স্বরূপ বানাইনি?"
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:
আইসোস্ট্যাসি (Isostasy): আধুনিক ভূ-তত্ত্ব অনুযায়ী, মাউন্ট এভারেস্টের মতো পাহাড়গুলোর উচ্চতা যদি ৯ কিমি হয়, তবে তার মূল বা ভিত্তি মাটির নিচে প্রায় ২৫-৩০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। এটি অনেকটা নৌকার নোঙ্গর বা পেরেকের মতো কাজ করে।
ভূ-ত্বকের স্থিতি: পাহাড়গুলো পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটগুলোকে স্থির রাখতে সাহায্য করে, যাতে পৃথিবী খুব বেশি কেঁপে না ওঠে। কুরআনেও বলা হয়েছে, আল্লাহ পাহাড় স্থাপন করেছেন যাতে পৃথিবী মানুষকে নিয়ে হেলে না পড়ে (সূরা লোকমান: ১০)।
৩. মিষ্টি ও লোনা পানির মিলনস্থল (Barrier between Seas)
দুটি সমুদ্রের পানি যখন একত্রে মিলিত হয়, তখন তাদের মধ্যে একটি প্রাকৃতিক বাধা বা পর্দা থাকে যা তাদের নিজস্ব ঘনত্ব, তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা বজায় রাখে।
কুরআনের বর্ণনা (সূরা আর-রহমান: ১৯-২০):
"তিনি পাশাপাশি দুই সমুদ্র প্রবাহিত করেছেন... উভয়ের মাঝখানে রয়েছে এক অন্তরাল (বারযাখ) যা তারা অতিক্রম করতে পারে না।"
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:
ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগর জিব্রাল্টার প্রণালীতে মিলিত হলেও তাদের পানি সরাসরি মিশে একাকার হয়ে যায় না। সারফেস টেনশন এবং ঘনত্বের পার্থক্যের কারণে তাদের মাঝে একটি অদৃশ্য পর্দা কাজ করে। এই বিস্ময়কর তথ্যটি বিংশ শতাব্দীতে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
সংক্ষেপে বৈজ্ঞানিক সামঞ্জস্য:
|
বিষয় |
কুরআনের শব্দ |
বৈজ্ঞানিক পরিভাষা |
|
সমুদ্রের নিচ |
তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ |
Internal Waves (অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ) |
|
পাহাড় |
আওতাদ (পেরেক) |
Roots of Mountains (পাহাড়ের মূল) |
|
পানি |
বারযাখ (অন্তরাল) |
Surface Tension/Halocline |
কুরআনের এই বৈজ্ঞানিক অলৌকিকতাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এটি কোনো মানুষের কল্পনা নয়, বরং স্রষ্টার বাণী।
আল-কুরআনে প্রাণীজগতের ক্ষুদ্র এই সদস্যদের নামে আস্ত একেকটি সূরা রয়েছে (যেমন: সূরা আন-নাহল বা মৌমাছি, সূরা আন-নামল বা পিঁপড়া, এবং সূরা আল-আনকাবুত বা মাকড়সা)। আধুনিক প্রাণিবিজ্ঞান (Zoology) এই পতঙ্গদের সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছে, তা কুরআনে ১৪০০ বছর আগেই চমৎকারভাবে বর্ণিত হয়েছে।
নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. মৌমাছির বিস্ময়কর জীবন (সূরা আন-নাহল: ৬৮-৬৯)
কুরআনে মৌমাছিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কীভাবে তারা ঘর (চাক) বানাবে এবং মধু সংগ্রহ করবে।
স্ত্রী মৌমাছির ভূমিকা: কুরআনে মৌমাছিকে সম্বোধন করতে গিয়ে স্ত্রীলিঙ্গ (Arabic: Fasluki) ব্যবহার করা হয়েছে।
আধুনিক বিজ্ঞান: আজ আমরা জানি যে মধু সংগ্রহ করা, চাক বানানো এবং সব কাজ মূলত স্ত্রী কর্মী মৌমাছিরা করে। পুরুষ মৌমাছিদের (Drones) কাজ কেবল প্রজনন।
মধু নিরাময়: কুরআনে বলা হয়েছে, "তাদের পেট থেকে নির্গত পানীয় (মধু) মানুষের জন্য নিরাময়।"
বিজ্ঞান: মধু একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপটিক এবং এতে এমন সব উপাদান আছে যা ক্ষত সারাতে ও রোগ প্রতিরোধে অতুলনীয়।
২. পিঁপড়ার উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা (সূরা আন-নামল: ১৮)
সুলাইমান (আ.)-এর কাহিনীর বর্ণনায় একটি পিঁপড়ার কথা এসেছে যে তার জাতিকে সতর্ক করছিল:
"হে পিঁপড়ারা, তোমরা তোমাদের ঘরে প্রবেশ করো, পাছে সুলাইমান ও তার বাহিনী তোমাদের পিষ্ট করে ফেলে..."
বিস্ময়কর তথ্য: এখানেও পিঁপড়াকে সম্বোধন করতে স্ত্রীবাচক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানে প্রমাণিত যে পিঁপড়াদের কলোনি বা সমাজ পরিচালনা করে রানী ও কর্মী স্ত্রী পিঁপড়ারা।
যোগাযোগ: পিঁপড়ারা যে নিজেদের মধ্যে সুসংগঠিতভাবে কথা বলতে বা সংকেত আদান-প্রদান করতে পারে (Pheromones-এর মাধ্যমে), তা বিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন।
৩. মাকড়সার নড়বড়ে ঘর (সূরা আল-আনকাবুত: ৪১)
আল্লাহ তাআলা যারা তাঁকে ছাড়া অন্যকে অভিভাবক মানে, তাদের উদাহরণ দিয়েছেন মাকড়সার ঘরের সাথে:
"মাকড়সার দৃষ্টান্ত সেই যে নিজের জন্য একটি ঘর বানায়; আর ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘরই তো সবচেয়ে দুর্বল, যদি তারা জানত!"
বৈজ্ঞানিক সূক্ষ্মতা: বিজ্ঞান বলে, মাকড়সার জালের সুতা (Spider Silk) স্টিলের চেয়েও শক্ত। তাহলে কুরআন কেন একে 'দুর্বল' বলল?
ব্যাখ্যা: এখানে 'দুর্বল' বলতে মাকড়সার পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর কথা বোঝানো হয়েছে। মাকড়সার পরিবারে কোনো মায়া নেই; স্ত্রী মাকড়সা মিলনের পর পুরুষ মাকড়সাকে খেয়ে ফেলে এবং অনেক সময় সন্তানরা মাকে খেয়ে ফেলে। এই চরম বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণেই মাকড়সার ঘরকে সবচেয়ে দুর্বল বলা হয়েছে।
প্রাণিজগৎ নিয়ে কুরআনের কিছু বিশেষ দিক:
|
পতঙ্গ |
কুরআনের তথ্য |
আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার |
|
মৌমাছি |
স্ত্রী মৌমাছি কাজ করে |
Worker bees are female. |
|
পিঁপড়া |
উন্নত যোগাযোগ ও সমাজ |
Highly social and organized structure. |
|
মাকড়সা |
ঘরটি অত্যন্ত নড়বড়ে/অনিরাপদ |
Social & biological fragility (Cannibalism). |
একটি মজার তথ্য: কুরআনে মৌমাছি সম্পর্কে যে সূরায় বলা হয়েছে (সূরা আন-নাহল), সেটি কুরআনের ১৬ নম্বর সূরা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, পুরুষ মৌমাছির ক্রোমোজোম সংখ্যাও ঠিক ১৬টি!
কুরআনে বর্ণিত উদ্ভিদের ঔষধি গুণ বা মানুষের আঙুলের ছাপের (Fingerprint) রহস্য
আল-কুরআনে মানুষের আঙুলের ছাপ (Fingerprint) এবং বিভিন্ন উদ্ভিদের ঔষধি গুণ নিয়ে যে বর্ণনা রয়েছে, তা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ফরেনসিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. মানুষের আঙুলের ছাপের রহস্য (Fingerprint)
১৮৮০ সালের দিকে বিজ্ঞানীরা প্রথম আবিষ্কার করেন যে, বিশ্বের প্রতিটি মানুষের আঙুলের ছাপ ভিন্ন এবং এটি কখনো পরিবর্তন হয় না। কিন্তু কুরআন এটি ১৪০০ বছর আগেই ঘোষণা করেছে।
কুরআনের বর্ণনা (সূরা আল-কিয়ামাহ: ৩-৪):
"মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার হাড়গুলো একত্রিত করতে পারব না? অবশ্যই! আমি তার আঙুলের ডগা (Finger tips) পর্যন্ত সঠিকভাবে পুনর্বিন্যস্ত করতে সক্ষম।"
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:
অনন্য পরিচয়: কিয়ামতের দিন পুনরুত্থানের বর্ণনায় আল্লাহ কেন বিশেষভাবে 'আঙুলের ডগা'র কথা বললেন? কারণ, মানুষের শরীরের অন্য সব অঙ্গ পুনর্গঠন করা গেলেও আঙুলের ছাপ অত্যন্ত সূক্ষ্ম বিষয়।
ফরেনসিক বিজ্ঞান: আজ অপরাধী শনাক্ত করতে বা বায়োমেট্রিক আইডেন্টিটিতে আঙুলের ছাপ ব্যবহার করা হয়, কারণ জমজ ভাই-বোনেরও আঙুলের ছাপ এক হয় না। কুরআন এই সূক্ষ্মতম পার্থক্যের দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহর অসীম ক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে।
২. কুরআনে বর্ণিত উদ্ভিদের ঔষধি গুণ
কুরআনে এমন কিছু ফল ও উদ্ভিদের কথা বলা হয়েছে, যেগুলোকে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান 'সুপার ফুড' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ক. জয়তুন বা জলপাই (Olive)
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা জয়তুনের কসম খেয়েছেন (সূরা তীন)। একে 'মুবারক' বা বরকতময় গাছ বলা হয়েছে।
বিজ্ঞান: জয়তুনের তেলে আছে ওমেগা-৯ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা হৃদরোগ প্রতিরোধ করে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়। একে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম স্বাস্থ্যকর তেল মনে করা হয়।
খ. ডুমুর (Fig)
কুরআনে সূরা তীন-এ ডুমুর ফলের কথা এসেছে।
বিজ্ঞান: ডুমুরে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার, ক্যালসিয়াম এবং পটাশিয়াম থাকে। এটি হজমশক্তি বাড়াতে এবং হাড় মজবুত করতে জাদুর মতো কাজ করে।
গ. মধু (Honey)
কুরআন স্পষ্টভাবে বলেছে যে, মধুতে মানুষের জন্য "শিফা" বা রোগমুক্তি রয়েছে (সূরা আন-নাহল: ৬৯)।
বিজ্ঞান: মধু একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টি-বায়োটিক। এটি কাশি, আলসার এবং ত্বকের ইনফেকশন সারাতে অত্যন্ত কার্যকর। এতে থাকা গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ শরীরকে তাৎক্ষণিক শক্তি দেয়।
ঘ. খেজুর (Dates)
মরিয়ম (আ.)-এর প্রসব বেদনার সময় তাকে খেজুর খাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল (সূরা মারইয়াম: ২৫)।
বিজ্ঞান: খেজুরে আছে প্রচুর আয়রন ও চিনি, যা প্রসব পরবর্তী রক্তস্বল্পতা দূর করে এবং শরীরে দ্রুত শক্তি জোগায়। এটি জরায়ুর মাংসপেশিকে শিথিল করতেও সাহায্য করে।
কুরআনে বর্ণিত কিছু বিশেষ উদ্ভিদ ও তাদের উপকারিতা:
|
উদ্ভিদ/ফল |
কুরআনের উদ্ধৃতি |
প্রধান বৈজ্ঞানিক গুণ |
|
কালোজিরা |
(হাদিসে বর্ণিত) |
সকল রোগের প্রতিষেধক (ইমিউন বুস্টার)। |
|
আদা |
সূরা দাহর: ১৭ |
হজমকারক ও প্রদাহনাশক (Anti-inflammatory)। |
|
আনার (ডালিম) |
সূরা আর-রহমান: ৬৮ |
রক্তস্বল্পতা দূর করে ও হৃদপিণ্ড ভালো রাখে। |
|
আঙুর |
সূরা মুমিনুন: ১৯ |
চোখের জ্যোতি বাড়াতে ও ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়ক। |
সারকথা:
কুরআনের এই বর্ণনাগুলো প্রমাণ করে যে, আল্লাহ মানুষের দেহ ও মনের সুস্থতার জন্য প্রকৃতিতে কী কী নেয়ামত রেখেছেন। এটি কেবল আধ্যাত্মিক মুক্তি নয়, বরং শারীরিক সুস্থতারও এক পূর্ণাঙ্গ প্রেসক্রিপশন।
কুরআনে বর্ণিত মহাকাশের ব্ল্যাক হোল (Black Hole) বা নক্ষত্রের মৃত্যু নিয়ে বিস্ময়কর তথ্যগুলো :
মহাকাশ বিজ্ঞানের সবচেয়ে রহস্যময় বিষয় হলো ব্ল্যাক হোল (Black Hole) এবং নক্ষত্রের মৃত্যু। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astrophysics) গত শতাব্দীতে যা আবিষ্কার করেছে, পবিত্র কুরআনে তার অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও চমৎকার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ব্ল্যাক হোল (Black Hole): মহাকাশের অদৃশ্য পথপ্রদর্শক
ব্ল্যাক হোল হলো মহাকাশের এমন এক স্থান যেখানে অভিকর্ষ বল এতই শক্তিশালী যে আলো পর্যন্ত সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে এটি সম্পূর্ণ অদৃশ্য।
কুরআনের বর্ণনা (সূরা আত-তাকভীর: ১৫-১৬):
"আমি শপথ করছি সেই সব নক্ষত্রের, যারা পশ্চাতে অপসৃত হয় (পিছু হটে), যারা দ্রুত চলমান এবং যারা আত্মগোপন করে (অদৃশ্য হয়ে যায়)।"
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:
এখানে তিনটি গুণের কথা বলা হয়েছে:
খুন্নাস (Khunnas): যা পিছু হটে বা সঙ্কুচিত হয়। (ব্ল্যাক হোল তৈরি হয় বিশাল নক্ষত্র নিজের ভেতর নিজে সংকুচিত হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে)।
আল-জাওয়ার (Al-Jawar): যা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে মহাকাশে ছুটে চলে।
আল-কুন্নাস (Al-Kunnas): যা অদৃশ্য বা আত্মগোপনকারী। এটি মহাকাশের সব কিছুকে নিজের পেটে টেনে নিয়ে পরিষ্কার করে দেয় (Vacuum cleaner-এর মতো)।
২. নক্ষত্রের মৃত্যু ও জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়া
নক্ষত্ররা চিরকাল বেঁচে থাকে না; তাদের জ্বালানি (Hydrogen/Helium) শেষ হয়ে গেলে তারা ধ্বংস হয়ে যায়।
কুরআনের বর্ণনা (সূরা আন-নাজম: ১):
"শপথ নক্ষত্রের, যখন তা অস্তমিত হয় বা ধ্বংস হয়।"
আবার অন্য আয়াতে বলা হয়েছে:
"যখন নক্ষত্ররাজি আলোহীন/মলিন হয়ে যাবে।" (সূরা আত-তাকভীর: ২)
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:
বিজ্ঞান বলে, যখন একটি নক্ষত্রের কেন্দ্রের জ্বালানি শেষ হয়ে যায়, তখন সেটি তার উজ্জ্বলতা হারায় এবং 'মৃত নক্ষত্রে' পরিণত হয়। বড় নক্ষত্রগুলো সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস হয়, আর ছোটগুলো 'হোয়াইট ডোয়ার্ফ' (White Dwarf) হিসেবে আলোহীন হয়ে পড়ে।
৩. পালসার নক্ষত্র (The Piercing Star)
১৯৬৭ সালে বিজ্ঞানীরা এমন এক ধরনের নক্ষত্র আবিষ্কার করেন যা নিয়মিত বিরতিতে পালস বা শব্দের মতো সংকেত পাঠায়। একে বলা হয় Pulsar Star।
কুরআনের বর্ণনা (সূরা আত-তারিক: ১-৩):
"শপথ আকাশের এবং রাতে আবির্ভূত হওয়ার (আত-তারিক)। আপনি কি জানেন সেই রাতে আবির্ভূত হওয়া বস্তুটি কী? সেটি হলো উজ্জ্বল নক্ষত্র (আন-নাজমুত সাক্বিব)।"
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:
আত-তারিক (At-Tariq): এই শব্দের মূল অর্থ হলো "যে করাঘাত করে" বা "হাতুড়ি দিয়ে পিটায়"। পালসার নক্ষত্রগুলো ঠিক একইভাবে নিয়মিত ছন্দে রেডিও পালস তৈরি করে, যা শুনতে অনেকটা দরজায় করাঘাতের মতো লাগে।
আস-সাক্বিব (As-Saqib): এর অর্থ "ছিদ্রকারী" বা "ভেদকারী"। পালসার নক্ষত্র থেকে নির্গত তীব্র রশ্মি মহাকাশের অন্ধকার ভেদ করে বহু দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
৪. মহাবিশ্বের গুটিয়ে যাওয়া (The Big Crunch)
বিজ্ঞানীদের মতে, মহাবিশ্ব যেমন 'বিগ ব্যাং'-এর মাধ্যমে শুরু হয়েছে, তেমনি একদিন এটি আবার গুটিয়ে যাবে। একে বলা হয় The Big Crunch।
কুরআনের বর্ণনা (সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৪):
"সেদিন আমি আকাশকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে লিখিত কাগজ বা কিতাব গুটিয়ে রাখা হয়।"
এটি আধুনিক কসমোলজির সেই তত্ত্বের সাথে হুবহু মিলে যায় যেখানে বলা হয়েছে মহাবিশ্বের প্রসারণ বন্ধ হয়ে একদিন তা আবার সংকুচিত হয়ে বিন্দুতে পরিণত হবে।
মহাকাশ বিজ্ঞানের সংক্ষেপ:
|
বিষয় |
কুরআনিক পরিভাষা |
বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা |
|
ব্ল্যাক হোল |
খুন্নাস / কুন্নাস |
অদৃশ্য মহাকর্ষীয় দানব যা সব গিলে ফেলে। |
|
পালসার |
তারিক (করাঘাতকারী) |
তীব্র স্পন্দনশীল নক্ষত্র (Pulsating Star)। |
|
নক্ষত্রের মৃত্যু |
নুজুমুন কাদারাত |
উজ্জ্বলতা হারিয়ে মৃত নক্ষত্রে পরিণত হওয়া। |
|
মহাকাশ সংকোচন |
কিতাব গুটিয়ে রাখা |
Big Crunch (মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি)। |
উপসংহার:
এই বিশাল মহাবিশ্ব যে কোনো দৈব ঘটনা নয়, বরং এক মহান পরিকল্পনাকারীর সৃষ্টি—কুরআনের এই বৈজ্ঞানিক আয়াতগুলো তারই অকাট্য দলিল।
কুরআনে বর্ণিত সময় বা কালের আপেক্ষিকতা (Relativity of Time) :
আলবার্ট আইনস্টাইন ১৯০৫ সালে তার 'থিওরি অফ রিলেটিভিটি' বা আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মাধ্যমে বিশ্বকে জানিয়েছিলেন যে, সময় স্থির কোনো বিষয় নয়; বরং স্থান এবং গতির ওপর ভিত্তি করে সময় পরিবর্তিত হয়। বিস্ময়করভাবে, এই আধুনিক বৈজ্ঞানিক ধারণাটি পবিত্র কুরআনে ১৪০০ বছর আগেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিচে সময়ের আপেক্ষিকতা নিয়ে কুরআনের কয়েকটি বৈজ্ঞানিক দিক আলোচনা করা হলো:
১. আল্লাহর নিকট সময়ের হিসাব (Time Dilation)
বিজ্ঞান বলে, পৃথিবীর সময়ের সাথে মহাকাশের বা উচ্চতর মাত্রার সময়ের বিশাল পার্থক্য রয়েছে। কুরআনে ঠিক এই পার্থক্যটিই তুলে ধরা হয়েছে:
"তারা আপনাকে আযাব ত্বরান্বিত করতে বলে, অথচ আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি কখনই ভঙ্গ করবেন না। আপনার রবের কাছে একদিন তোমাদের গণনার এক হাজার বছরের সমান।" (সূরা আল-হাজ্জ: ৪৭)
আবার অন্য একটি আয়াতে বলা হয়েছে:
"তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সমস্ত বিষয় পরিচালনা করেন, অতঃপর তা তাঁর কাছেই ফিরে যায় এমন একদিনে, যার পরিমাণ তোমাদের গণনায় এক হাজার বছর।" (সূরা আস-সাজদাহ: ৫)
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা: এখানে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে, আমাদের (পৃথিবীর) সময় আর আল্লাহর বা মহাজাগতিক পরিমণ্ডলের সময় এক নয়। ১ দিন = ১০০০ বছর—এটি সময়ের আপেক্ষিকতার একটি নিখুঁত উদাহরণ।
২. উচ্চতর মাত্রায় অতি দ্রুত সময় (The 50,000 Year Scale)
কুরআনে আরেকটি আয়াতে সময়ের ব্যবধান আরও বহুগুণ বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে:
"ফেরেশতাগণ এবং রূহ (জিবরাঈল আ.) আল্লাহর দিকে আরোহণ করে এমন একদিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।" (সূরা আল-মা'আরিজ: ৪)
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা: ফেরেশতারা নূর বা আলো দিয়ে তৈরি। আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো বস্তু যখন আলোর গতিতে চলে, তখন তার জন্য সময় অত্যন্ত ধীর হয়ে যায় (Time Dilation)। ফেরেশতাদের গতির কারণে তাদের নিকট যা ১ দিন, মানুষের হিসাব অনুযায়ী তা ৫০,০০০ বছর। এটি উচ্চতর মাত্রার গতির সাথে সময়ের পরিবর্তনের সরাসরি ইঙ্গিত।
৩. পরকালে সময়ের অনুভূতি
মৃত্যুর পর বা কিয়ামতের দিন যখন মানুষকে পুনরুত্থিত করা হবে, তখন দুনিয়ার দীর্ঘ জীবন তাদের কাছে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মতো মনে হবে।
"আল্লাহ যেদিন তাদের একত্রিত করবেন, সেদিন তাদের মনে হবে যে, তারা (দুনিয়ায়) দিনের এক মুহূর্তের বেশি অবস্থান করেনি।" (সূরা ইউনুস: ৪৫)
অন্য আয়াতে (সূরা আন-নাযিয়াত: ৪৬) বলা হয়েছে, তাদের মনে হবে তারা মাত্র একটি বিকাল বা একটি সকাল দুনিয়ায় ছিল।
৪. আসহাবে কাহাফের কাহিনী ও সময়
সূরা কাহাফে বর্ণনা করা হয়েছে যে, একদল যুবক গুহার মধ্যে ৩০৯ বছর ঘুমিয়ে ছিল। কিন্তু যখন তারা জেগে উঠল, তখন তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল:
"আমরা কতক্ষণ অবস্থান করেছি? কেউ বলল—একদিন বা দিনের কিছু অংশ।" (সূরা কাহাফ: ১৯)
বিজ্ঞান: এখানে তাদের শরীরকে দীর্ঘ সময় পচন থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি তাদের জন্য সময়কে 'স্থবির' বা 'সংকুচিত' করে দেওয়া হয়েছিল, যা আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় 'টাইম ল্যাপস' বা আপেক্ষিকতার একটি রূপ।
সময়ের আপেক্ষিকতার তুলনামূলক চিত্র:
|
কুরআনের প্রেক্ষাপট |
পৃথিবীর সময় |
মহাজাগতিক/ঐশ্বরিক সময় |
|
সাধারণ পরিচালনা |
১০০০ বছর |
১ দিন |
|
ফেরেশতাদের আরোহণ |
৫০,০০০ বছর |
১ দিন |
|
পরকালে অনুভূতি |
পুরো জীবনকাল |
মাত্র কয়েক ঘণ্টা |
উপসংহার:
আইনস্টাইন গণিতের মাধ্যমে যা প্রমাণ করেছেন, কুরআন তা বিশ্বাসের ভাষায় এবং উপমার মাধ্যমে বহু আগেই মানবজাতিকে জানিয়ে দিয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন এমন এক সত্তার বাণী যিনি সময়ের ঊর্ধ্বে এবং যিনি সময়ের স্রষ্টা।
কুরআনে বর্ণিত আলোর গতি (Speed of Light) বা মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি:
কুরআনে আলোর গতি (Speed of Light) এবং মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি নিয়ে যে ইঙ্গিতগুলো রয়েছে, তা আধুনিক কসমোলজি ও পদার্থবিজ্ঞানের অত্যন্ত জটিল বিষয়ের সাথে মিলে যায়। নিচে এগুলো সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. আলোর গতি (The Speed of Light)
আধুনিক বিজ্ঞান অনুসারে আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩,০০,০০০ কিলোমিটার ($c \approx 299,792$ কিমি/সেকেন্ড)। কুরআনের একটি গাণিতিক হিসাব থেকে এই গতির চমৎকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
কুরআনের বর্ণনা (সূরা আস-সাজদাহ: ৫):
"তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সমস্ত বিষয় পরিচালনা করেন, অতঃপর তা তাঁর কাছেই ফিরে যায় এমন একদিনে, যার পরিমাণ তোমাদের গণনায় এক হাজার বছর।"
গাণিতিক বিশ্লেষণ:
বিংশ শতাব্দীর অনেক মুসলিম বিজ্ঞানী (যেমন: ড. মনসুর হাসাব এন-নবী) এই আয়াতের ওপর ভিত্তি করে একটি গাণিতিক সমীকরণ বের করেছেন:
এখানে বলা হয়েছে, আল্লাহর নির্দেশের ১ দিনের দূরত্ব = মানুষের গণনার ১০০০ বছরের (চন্দ্রের হিসেবে) অতিক্রান্ত দূরত্ব।
এক চন্দ্র-বছরে চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে যে দূরত্ব অতিক্রম করে, তাকে ১০০০ দিয়ে গুণ করলে যে বিশাল দূরত্ব পাওয়া যায়, তাকে ১ দিনের সেকেন্ড (৮৬,৪০০ সেকেন্ড) দিয়ে ভাগ করলে যে মান পাওয়া যায়, তা আধুনিক বিজ্ঞানের আলোর গতির প্রায় সমান।
২. মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি: 'দ্য বিগ ক্রাঞ্চ' (The Big Crunch)
মহাবিশ্ব কীভাবে শেষ হবে, সে বিষয়ে পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান তত্ত্ব হলো 'বিগ ক্রাঞ্চ'। এর অর্থ হলো—মহাবিশ্ব যেভাবে প্রসারিত হচ্ছে, একদিন তা উল্টো দিকে সংকুচিত হতে শুরু করবে এবং শেষে একটি বিন্দুতে ফিরে আসবে।
কুরআনের বর্ণনা (সূরা আল-আম্বিয়া: ১০৪):
"সেদিন আমি আকাশকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে লিখিত কাগজ বা কিতাব গুটিয়ে রাখা হয়। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, সেভাবেই আমি পুনরায় সৃষ্টি করব।"
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:
সংকোচন: বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এবং অন্যান্য কসমোলজিস্টরা বলেছেন, মহাবিশ্ব যদি তার প্রসারণ ক্ষমতা হারায়, তবে অভিকর্ষ বলের কারণে এটি আবার নিজের কেন্দ্রের দিকে ধাবিত হবে।
কাগজ গুটিয়ে রাখা: কুরআনের এই উপমাটি অদ্ভুতভাবে সঠিক। কারণ আধুনিক তত্ত্বে 'স্থান-কাল' (Space-time) কে একটি চাদর বা কাপড়ের মতো ধরা হয়। মহাবিশ্ব ধ্বংস হওয়ার সময় এই চাদরটিই ভাজ হয়ে গুটিয়ে যাবে।
৩. মহাকাশ ধোঁয়ায় পরিণত হওয়া
নক্ষত্ররা ধ্বংস হওয়ার সময় বা মহাবিশ্বের চরম অবস্থায় আকাশ ধোঁয়াকার হয়ে যাবে বলে কুরআনে উল্লেখ আছে।
কুরআনের বর্ণনা (সূরা আদ-দুখান: ১০):
"অতএব আপনি সেই দিনের অপেক্ষা করুন, যখন আকাশ ধোঁয়ায় (দুখান) আচ্ছন্ন হবে।"
বিজ্ঞান: নক্ষত্র যখন সুপারনোভা হয়ে ফেটে যায়, তখন তা বিশাল গ্যাস বা ধোঁয়ার মেঘ (Nebula) তৈরি করে। মহাবিশ্বের চূড়ান্ত ধ্বংসের সময় পুরো আকাশ এমন উত্তপ্ত গ্যাসে ভরে যাবে।
৪. সূর্য ও চন্দ্রের পরিণতি
সূর্য এক সময় তার জ্বালানি শেষ করে ফেলবে এবং অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাবে।
কুরআনের বর্ণনা (সূরা আল-ক্বিয়ামাহ: ৮-৯):
"যখন চন্দ্র জ্যোতিহীন হয়ে যাবে এবং সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে।"
বিজ্ঞান: আমাদের সূর্য যখন 'রেড জায়ান্ট' (Red Giant) অবস্থায় পৌঁছাবে, তখন এটি এতটাই বড় হবে যে চাঁদ এবং পৃথিবীকে নিজের ভেতর গ্রাস করে নেবে। অর্থাৎ সূর্য ও চাঁদ একই বিন্দুতে মিলিত হবে।
সংক্ষেপে ভবিষ্যতের দৃশ্যপট:
|
বিষয় |
কুরআনের ইঙ্গিত |
বৈজ্ঞানিক পরিভাষা |
|
মহাকাশ ভাঁজ হওয়া |
কিতাব গুটিয়ে রাখার মতো |
Curvature of Space-time / Big Crunch |
|
চন্দ্রের আলো নিভে যাওয়া |
চন্দ্র জ্যোতিহীন হবে |
Moon's future state |
|
সূর্য-চন্দ্রের মিলন |
একত্রিত করা হবে |
Sun swallowing inner planets |
উপসংহার:
কুরআনের এই বর্ণনাগুলো কেবল ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং এই মহাবিশ্বের যে একটি সুনির্দিষ্ট শুরু এবং শেষ আছে—তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। বিজ্ঞান কেবল ঘটনার বর্ণনা দেয়, আর কুরআন তার পেছনের স্রষ্টাকে চিনিয়ে দেয়।
কুরআনে বর্ণিত জিন জাতি বা ভিনগ্রহের প্রাণীর (Aliens) অস্তিত্ব :
পবিত্র কুরআনে এমন কিছু আয়াত রয়েছে যা ইঙ্গিত দেয় যে, এই বিশাল মহাবিশ্বে পৃথিবী ছাড়াও অন্যান্য স্থানে প্রাণের অস্তিত্ব থাকা অসম্ভব নয়। একইভাবে 'জিন' জাতির সৃষ্টিতত্ত্ব এবং তাদের প্রকৃতি নিয়েও কুরআনে চমৎকার বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা রয়েছে।
নিচে বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ভিনগ্রহের প্রাণী (Aliens): কুরআনের সংকেত
আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং NASA-র মতো সংস্থাগুলো প্রতিনিয়ত 'এক্সোপ্ল্যানেট' (Exoplanets) বা পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য গ্রহ খুঁজছে। কুরআনে মহাবিশ্বের অন্যত্র প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে বেশ কিছু জোরালো ইঙ্গিত রয়েছে:
সৃষ্টির বিস্তার: আল্লাহ বলেন:
"তাঁর অন্যতম নিদর্শন হলো আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি এবং এতদুভয়ের মধ্যে তিনি যে সব জীবজন্তু (দা'ব্বাহ) ছড়িয়ে দিয়েছেন সেগুলো।" (সূরা আশ-শূরা: ২৯)
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা: এখানে আরবি শব্দ 'দা'ব্বাহ' (Dabbah) ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ হলো এমন প্রাণী যারা জমিনে বিচরণ করে বা চলাফেরা করে। ফেরেশতারা ডানা দিয়ে ওড়ে, তাই তাদের সাধারণত 'দা'ব্বাহ' বলা হয় না। 'আসমান ও জমিনের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া' কথাটি ইঙ্গিত দেয় যে, পৃথিবীর বাইরেও প্রাণের অস্তিত্ব থাকা সম্ভব।
সপ্ত আকাশ ও পৃথিবী: আল্লাহ বলেন:
"আল্লাহ তিনিই, যিনি সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং পৃথিবীর অনুরূপও তদ্রূপ।" (সূরা আত-তালাক: ১২)
বিজ্ঞান: এটি ইঙ্গিত দেয় যে মহাবিশ্বে পৃথিবীর মতো আরও অনেক গ্রহ থাকতে পারে যেখানে প্রাণের বিকাশ ঘটা স্বাভাবিক।
২. জিন জাতি (Jinn): শক্তির রূপান্তর
কুরআন অনুযায়ী জিনরা মানুষের মতো একটি জাতি, তবে তাদের সৃষ্টিতত্ত্ব ভিন্ন।
সৃষ্টির উপাদান: আল্লাহ বলেন:
"আর তিনি জিনকে সৃষ্টি করেছেন অগ্নিশিখা (মারিজিন মিন নার) থেকে।" (সূরা আর-রহমান: ১৫)
বৈজ্ঞানিক সমান্তরাল: আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সব কিছুই শক্তি (Energy) এবং পদার্থের (Matter) খেলা। 'অগ্নিশিখা' বা 'ধোঁয়াহীন আগুন' বলতে প্লাজমা (Plasma) বা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন শক্তির একটি রূপকে বোঝানো হতে পারে। জিনরা যেহেতু শক্তির একটি রূপ, তাই তারা মানুষের চোখের অদৃশ্য এবং অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলাচল করতে সক্ষম।
৩. মহাকাশে জিনদের যাতায়াত ও বাধা
কুরআনে বলা হয়েছে যে, জিনরা এক সময় মহাকাশে উচ্চতর স্থানে গিয়ে তথ্য শোনার চেষ্টা করত, কিন্তু এখন তারা বাধার সম্মুখীন হয়।
উজ্জ্বল উল্কাপিণ্ড (Meteorites): > "আমরা আকাশের খবর নিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু দেখতে পেলাম তা কঠোর প্রহরী ও উল্কাপিণ্ড (শিহাব) দ্বারা পূর্ণ।" (সূরা আল-জিন: ৮)
বিজ্ঞান: মহাকাশের ভ্যান অ্যালেন বেল্ট (Van Allen Belts) এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে মহাজাগতিক রশ্মি ও উল্কাপাত পৃথিবীকে বাইরের অনেক প্রভাব থেকে রক্ষা করে। এটি জিনদের মতো উচ্চ শক্তির সত্তার জন্যও এক প্রকার সীমানা হিসেবে কাজ করে।
৪. তুলনামূলক বিশ্লেষণ: মানুষ বনাম জিন বনাম ভিনগ্রহী
|
সত্তা |
সৃষ্টির উপাদান |
অবস্থান |
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি |
|
মানুষ |
মাটি/জৈব উপাদান |
পৃথিবী |
দৃশ্যমান ও বস্তুগত প্রাণ। |
|
জিন |
উত্তাপ/অগ্নিশিখা |
পৃথিবীর অদৃশ্য মাত্রা |
অদৃশ্য শক্তি বা প্লাজমা ভিত্তিক অস্তিত্ব। |
|
ভিনগ্রহী |
অজানা |
অন্য গ্রহ বা গ্যালাক্সি |
জৈবিক বা অজৈবিক প্রাণের সম্ভাবনা। |
উপসংহার:
কুরআন স্পষ্টভাবে মহাবিশ্বকে কেবল মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ বলেনি। বরং "রাব্বুল আলামীন" (বিশ্বজগতের প্রতিপালক) হিসেবে আল্লাহ এমন আরও অনেক জগত বা প্রাণের স্রষ্টা হতে পারেন যা আমাদের কল্পনার অতীত। বিজ্ঞান আজ যা খুঁজছে, কুরআন তার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছে বহু আগে।
কুরআনে বর্ণিত ডাইনোসর বা প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর কোনো ইঙ্গিত অথবা মানুষের বিবর্তনবাদ (Evolution) সম্পর্কে কুরআনের অবস্থান
প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী বা ডাইনোসর এবং ডারউইনের বিবর্তনবাদ—এই দুটি বিষয়ই আধুনিক বিজ্ঞানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে সরাসরি নাম ধরে কিছু বলা না হলেও এমন কিছু মৌলিক ইঙ্গিত রয়েছে যা বর্তমান বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নিচে বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ডাইনোসর ও প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী
কুরআনে 'ডাইনোসর' শব্দটি নেই, তবে আল্লাহ তায়ালা এমন অনেক সৃষ্টির কথা বলেছেন যা মানুষ একসময় জানত না।
অজানা সৃষ্টি: আল্লাহ বলেন:
"তিনি ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা সৃষ্টি করেছেন তোমাদের আরোহণের জন্য ও শোভার জন্য এবং তিনি এমন কিছু সৃষ্টি করেন যা তোমরা জানো না।" (সূরা আন-নাহল: ৮)
ব্যাখ্যা: এই 'জান না' কথাটি ডাইনোসর বা প্রাগৈতিহাসিক বিশালকায় প্রাণীদের অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, যাদের অস্তিত্ব মানুষ কেবল গত দুই শতাব্দীতে জীবাশ্মের (Fossils) মাধ্যমে জানতে পেরেছে।
বিশালকায় প্রাণী (দা'ব্বাহ): কুরআনে বলা হয়েছে যে আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রকার বিচরণশীল প্রাণী (দা'ব্বাহ) ছড়িয়ে দিয়েছেন। জীবাশ্ম বিজ্ঞান আমাদের দেখায় যে পৃথিবীতে একসময় এমন সব বিশাল প্রাণী ছিল যারা বর্তমানে বিলুপ্ত। এটি আল্লাহর সৃষ্টির বৈচিত্র্য ও ক্ষমতারই অংশ।
২. মানুষের বিবর্তনবাদ (Evolution) ও কুরআনের অবস্থান
বিবর্তনবাদ নিয়ে কুরআন ও বিজ্ঞানের মধ্যে কিছু জায়গায় মিল আছে, আবার কিছু জায়গায় মৌলিক পার্থক্য আছে।
ক. প্রাণের উৎপত্তি পানি থেকে (ঐক্যমত)
ডারউইনের তত্ত্ব অনুযায়ী আদি প্রাণ সৃষ্টি হয়েছে পানি থেকে। কুরআন ১৪০০ বছর আগেই এটি ঘোষণা করেছে:
"আমি প্রতিটি জীবন্ত বস্তুকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছি।" (সূরা আম্বিয়া: ৩০)
খ. ধাপে ধাপে সৃষ্টি (Creation in Stages)
বিবর্তনবাদ যেমন বলে প্রাণের বিকাশ ধাপে ধাপে হয়েছে, কুরআনও তেমন ইঙ্গিত দেয়:
"তিনি তোমাদেরকে বিভিন্ন পর্যায়ে (ধাপে ধাপে) সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা নূহ: ১৪)
ব্যাখ্যা: অনেক তাফসীরকারক মনে করেন, এটি কেবল মাতৃগর্ভের স্তর নয়, বরং সামগ্রিক মানবজাতি সৃষ্টির বিভিন্ন স্তরকেও নির্দেশ করতে পারে।
গ. পার্থক্যের জায়গা: আদম (আ.)-এর সৃষ্টি
বিবর্তনবাদ বলে মানুষ অন্য কোনো আদিম প্রজাতি (যেমন এপ বা শিম্পাঞ্জি) থেকে বিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু কুরআনের অবস্থান এখানে স্পষ্ট:
সরাসরি সৃষ্টি: আল্লাহ আদম (আ.)-কে মাটি থেকে সরাসরি সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর ভেতরে 'রূহ' ফুঁকে দিয়েছেন।
উত্তরাধিকার: মানুষের শারীরিক কাঠামোতে অন্য প্রাণীর সাথে মিল থাকতে পারে (যেহেতু একই স্রষ্টা এবং একই জৈব উপাদান), কিন্তু মানুষ কোনো জানোয়ার থেকে বিবর্তিত হয়ে আসেনি। বরং মানুষ এক বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন সৃষ্টি।
৩. প্রাণের পরিবর্তন ও অভিযোজন
বিজ্ঞান বলে প্রাণীরা পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে নিজেদের পরিবর্তন করে। কুরআনে বনী ইসরাঈলের একটি অবাধ্য গোষ্ঠীকে শাস্তিস্বরূপ 'বানরে' রূপান্তরিত করার কথা বলা হয়েছে (সূরা বাকারা: ৬৫)। এটি ইঙ্গিত দেয় যে আল্লাহর হুকুমে জিনগত বা শারীরিক পরিবর্তন ঘটা অসম্ভব নয়, তবে তা কেবল প্রাকৃতিক বিবর্তন নয়, বরং আল্লাহর ইচ্ছাধীন।
সংক্ষেপে কুরআন ও বিজ্ঞানের তুলনা:
|
বিষয় |
বিবর্তনবাদ (Science) |
কুরআনের অবস্থান |
|
প্রাণের শুরু |
পানি থেকে শুরু। |
পানি থেকেই সব প্রাণের সৃষ্টি। |
|
সৃষ্টির স্তর |
ধীরগতির বিবর্তন। |
ধাপে ধাপে সৃষ্টি (আতওয়ারা)। |
|
মানুষের আদি উৎস |
পূর্বপুরুষ অন্য প্রাণী। |
আদম (আ.) প্রথম মানুষ ও স্বতন্ত্র সৃষ্টি। |
|
অজানা প্রাণী |
ডাইনোসর/বিলুপ্ত প্রজাতি। |
এমন অনেক সৃষ্টি যা মানুষ জানত না। |
সারকথা:
কুরআন স্বীকার করে যে সৃষ্টিজগত গতিশীল এবং আল্লাহ প্রতিনিয়ত নতুন কিছু সৃষ্টি করছেন। তবে মানুষের ক্ষেত্রে কুরআন তাকে "আশরাফুল মাখলুকাত" বা সৃষ্টির সেরা হিসেবে অভিহিত করে একটি বিশেষ সম্মান দিয়েছে, যা তাকে কেবল একটি উন্নত জানোয়ার হিসেবে দেখার বিজ্ঞানমনস্ক ধারণার ঊর্ধ্বে রাখে।
কুরআনে বর্ণিত হারানো শহর (যেমন: ইরাম বা আদ জাতি) যাদের ধ্বংসাবশেষ সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে, সে সম্পর্কে রোমাঞ্চকর নিদর্শন।
কুরআনে বর্ণিত 'ইরাম' (Iram) শহর এবং 'আদ' (Ad) জাতির কাহিনী এক সময় অনেক ইতিহাসবিদের কাছে কেবল রূপকথা মনে হতো। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলো প্রমাণ করেছে যে, এই শহরটি আসলেও অস্তিত্বশীল ছিল এবং এটি ছিল তার সময়ের সবচেয়ে আধুনিক ও জাঁকজমকপূর্ণ শহর।
নিচে এই রোমাঞ্চকর নিদর্শনগুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো:
১. ইরাম: বালুর নিচে লুকানো 'স্তম্ভের শহর'
কুরআনে এই শহরটিকে বিশেষভাবে বর্ণনা করা হয়েছে এর বিশালতা ও স্থাপত্যশৈলীর জন্য।
"আপনি কি দেখেননি আপনার রব আদ বংশের ইরামের সাথে কী করেছিলেন? যাদের ছিল সুউচ্চ স্তম্ভ (ইমাদ), যার সমতুল্য কোনো শহর আগে কোনো দেশে নির্মিত হয়নি।" (সূরা আল-ফজর: ৬-৮)
আবিষ্কারের রোমাঞ্চ:
আবিষ্কার: ১৯৯২ সালে লরেন্স অব অ্যারাবিয়া খ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিকরা ওমানের 'উবার' (Ubar) নামক স্থানে একটি ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পান। নাসা (NASA)-র স্যাটেলাইট ইমেজের সাহায্যে বালুর নিচে চাপা পড়া প্রাচীন কাফেলা চলার পথ অনুসরণ করে এই শহরটি খুঁজে পাওয়া যায়।
স্তম্ভের মিল: খননকার্যের পর দেখা যায়, শহরটিতে সত্যিই বিশাল বিশাল আটকোণা স্তম্ভ ছিল, যা হুবহু কুরআনের বর্ণনার সাথে মিলে যায়। এ কারণেই একে বলা হয় "অ্যাটলান্টিস অফ দ্য স্যান্ড" বা বালুর নিচে হারানো শহর।
২. আদ জাতি: এক শক্তিশালী ও দীর্ঘকায় জাতি
আদ জাতি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী এবং তারা পাহাড় কেটে ঘর বানাতে ও বড় বড় দালান তৈরিতে দক্ষ ছিল।
ভৌগোলিক অবস্থান: তারা বাস করত 'আল-আহকাফ' (Al-Ahqaf) নামক অঞ্চলে, যা বর্তমানে ওমান ও ইয়েমেনের মধ্যবর্তী বালুকাময় মরুভূমি।
অহংকার ও ধ্বংস: তারা তাদের শক্তির বড়াই করে বলত, "আমাদের চেয়ে শক্তিশালী আর কে আছে?" (সূরা ফুসসিলাত: ১৫)। শেষ পর্যন্ত এক প্রচণ্ড শীতল ও বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের মাধ্যমে তাদের ধ্বংস করা হয়।
৩. সামুদ জাতি ও মাদায়েন সালেহ (শৈল-শহর)
আদ জাতির পর সামুদ জাতি এসেছিল, যারা পাহাড় খোদাই করে সুরম্য অট্টালিকা বানাত। সৌদি আরবের 'মাদায়েন সালেহ' বা 'আল-হিজর' (Al-Hijr) নামক স্থানে তাদের ধ্বংসাবশেষ আজও অক্ষত অবস্থায় আছে।
UNESCO স্বীকৃতি: ২০০৮ সালে এটি সৌদি আরবের প্রথম স্থান হিসেবে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পায়।
কুরআনের বর্ণনা: "তোমরা পাহাড় কেটে ঘর বানাতে এবং সমতলে প্রাসাদ নির্মাণ করতে।" (সূরা আল-আরাফ: ৭৪)। সেখানে আজও বিশাল বিশাল পাহাড়ের গায়ে নিখুঁত কারুকাজ করা দরজা ও ঘর দেখা যায় যা আধুনিক যুগের মানুষকেও অবাক করে।
৪. লূত (আ.)-এর জাতি ও মৃত সাগর (Dead Sea)
লূত (আ.)-এর অবাধ্য জাতিকে এক প্রচণ্ড ভূমিকম্প ও উল্টানো বৃষ্টির মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছিল।
বর্তমান নিদর্শন: জর্ডানে অবস্থিত মৃত সাগর বা ডেড সি-র এলাকাটিকেই সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত শহর 'সাদুম' (Sodom) বলে চিহ্নিত করা হয়। এই সাগরের পানি এতই লবণাক্ত যে এখানে কোনো মাছ বাঁচে না এবং এর তলদেশ পৃথিবীর স্থলভাগের সবচেয়ে নিচু বিন্দু। কুরআনে বলা হয়েছে, তাদের শহরকে উল্টে দেওয়া হয়েছিল এবং তাদের ওপর পোড়া মাটির পাথর বর্ষণ করা হয়েছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সারসংক্ষেপ:
|
জাতি/শহর |
কুরআনের বর্ণনা |
আধুনিক অবস্থান |
বিশেষ বৈশিষ্ট্য |
|
আদ (ইরাম) |
সুউচ্চ স্তম্ভের শহর। |
ওমান (উবার)। |
বালুর নিচে চাপা পড়া স্তম্ভবিশিষ্ট শহর। |
|
সামুদ (আল-হিজর) |
পাহাড় খোদাই করা ঘর। |
সৌদি আরব (মাদায়েন সালেহ)। |
আস্ত পাহাড় কেটে বানানো নিখুঁত অট্টালিকা। |
|
লূত (আ.)-এর জাতি |
উল্টে দেওয়া জনপদ। |
জর্ডান (মৃত সাগর)। |
উচ্চ লবণাক্ততা ও নিম্নতম ভূমি। |
শিক্ষণীয় দিক: কুরআন এই ধ্বংসাবশেষগুলো দেখার এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ বলেন: "তারা কি পৃথিবীতে ভ্রমণ করে না? তাহলে তারা দেখত তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কী হয়েছিল।" (সূরা রুম: ৯)
ফেরাউনের (Pharaoh) মমি এবং তার লাশের অবিকল থাকা নিয়ে কুরআনের বিস্ময়কর ভবিষ্যৎবাণী সম্পর্কে বিজ্ঞানের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ
ফেরাউনের মমি এবং তার লাশের অক্ষত থাকা আধুনিক বিজ্ঞানের জন্য কেবল একটি আবিষ্কার নয়, বরং এটি পবিত্র কুরআনের এক জীবন্ত অলৌকিকতা। ১৯ শতকের শেষের দিকে যখন ফেরাউনের মমি আবিষ্কৃত হয়, তখন সারা বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছিল যে, ৩০০০ বছর আগের একটি মৃতদেহ কীভাবে এত নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত থাকতে পারে।
নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত এবং রোমাঞ্চকর তথ্যগুলো দেওয়া হলো:
১. কুরআনের সেই অদ্বিতীয় ভবিষ্যৎবাণী
মূসা (আ.)-এর সময়কার অহংকারী ফেরাউন যখন লোহিত সাগরে ডুবে মরছিল, তখন সে বাঁচার জন্য ঈমান আনার দাবি করেছিল। কিন্তু আল্লাহ তার তওবা কবুল না করে এক বিশেষ ঘোষণা দিয়েছিলেন:
"আজ আমি তোমার দেহটি (মরদেহ) সংরক্ষণ করব, যাতে তুমি তোমার পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নিদর্শন (আয়াত) হয়ে থাকো। আর অবশ্যই মানুষের মধ্যে অনেকেই আমার নিদর্শনাবলী সম্পর্কে গাফেল।" (সূরা ইউনুস: ৯২)
বিস্ময়কর দিক: বাইবেল বা অন্য কোনো প্রাচীন গ্রন্থে ফেরাউনের লাশ সংরক্ষণের কথা বলা হয়নি; বরং বলা হয়েছিল সে সাগরে ডুবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কিন্তু কুরআন স্পষ্টভাবে লাশটি টিকে থাকার কথা বলেছিল।
২. মমি আবিষ্কার ও আধুনিক বিজ্ঞান
১৮৮১ সালে মিশরের থিবস নামক স্থানে একটি গোপন গুহায় বেশ কিছু রাজকীয় মমি পাওয়া যায়, যার মধ্যে দ্বিতীয় রামসেস (Ramesses II) বা মূসা (আ.)-এর সমসাময়িক ফেরাউনের লাশটি শনাক্ত করা হয়।
লবণাক্ততার প্রমাণ: ১৯৭৫ সালে ফরাসি সার্জন ডা. মরিস বুকাইলি (Dr. Maurice Bucaille) এই মমির ওপর গবেষণা করেন। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন যে, মমির শরীরে সামুদ্রিক লবণের কণা লেগে আছে, যা প্রমাণ করে যে এই ব্যক্তিটি সাগরে ডুবে মারা গিয়েছিল।
হাড়ের আঘাত: এক্স-রে রিপোর্টে দেখা যায় যে, প্রচণ্ড পানির চাপে তার হাড়গুলো ভেঙে গিয়েছিল, কিন্তু অলৌকিকভাবে তার চামড়া ও মাংস অক্ষত ছিল।
৩. বিজ্ঞানের জন্য চ্যালেঞ্জ ও ডা. মরিস বুকাইলির ইসলাম গ্রহণ
ডা. মরিস বুকাইলি যখন জানতে পারলেন যে, আধুনিক বিজ্ঞানের এই আবিষ্কারের কথা মুসলমানরা ১৪০০ বছর আগেই তাদের ধর্মগ্রন্থে জানত, তখন তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান। তিনি ভাবলেন:
সেই যুগে কোনো মানুষের পক্ষে সাগরের নিচে ডুবে যাওয়া লাশ খুঁজে পাওয়া বা তা সংরক্ষিত থাকার কথা জানা অসম্ভব।
মমিটি বালুর নিচে চাপা পড়া অবস্থায় আবিষ্কৃত হওয়ার অনেক আগেই কুরআন এই কথা ঘোষণা করেছে।
এই বিস্ময়কর সত্যটি তাকে এতটাই প্রভাবিত করে যে, তিনি পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তার বিখ্যাত বই "The Bible, The Qur'an and Science" রচনা করেন।
৪. সংরক্ষণের অলৌকিকত্ব বনাম সাধারণ মমি
সাধারণত প্রাচীন মিশরে মমি করার সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (ফুসফুস, পাকস্থলী ইত্যাদি) বের করে নেওয়া হতো। কিন্তু এই ফেরাউনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তার লাশটি সাগরে ডোবার পর অলৌকিকভাবে তীরের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল এবং পরে মিশরীয়রা তা উদ্ধার করে মমি করেছিল।
|
বিষয় |
সাধারণ ধারণা/ইতিহাস |
কুরআনের তথ্য ও বিজ্ঞান |
|
মৃত্যুর ধরন |
যুদ্ধে বা বার্ধক্যে মৃত্যু। |
সাগরে ডুবে মৃত্যু (দেহে লবণের উপস্থিতি)। |
|
মরদেহের দশা |
ধ্বংস হয়ে যাওয়া বা হারিয়ে যাওয়া। |
পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষিত। |
|
আবিষ্কারের সময় |
১৮৮১ সাল (আধুনিক যুগ)। |
৬১০-৬৩২ খ্রিস্টাব্দ (কুরআনে বর্ণিত)। |
শিক্ষণীয় দিক: ফেরাউনের এই সংরক্ষিত দেহটি আজ মিশরের কায়রো মিউজিয়ামে রাখা আছে। এটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতা বা অহংকার চিরস্থায়ী নয়, বরং আল্লাহর বিধানই চূড়ান্ত।
কুরআনে বর্ণিত প্রাচীন মিশরের পিরামিড তৈরির রহস্য (পোড়া মাটি) কুরআনের আয়াতটি আধুনিক বিজ্ঞানীদের অবাক করে দিয়েছে
প্রাচীন মিশরের পিরামিড এবং বিশাল সব অট্টালিকা কী দিয়ে তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক ও বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক ছিল। সাধারণ ধারণা ছিল যে, এগুলো বিশাল সব পাথরের খণ্ড কেটে তৈরি। কিন্তু পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত এই নির্মাণের যে রহস্য উন্মোচন করেছে, তা বিংশ শতাব্দীর আধুনিক ল্যাবরেটরি গবেষণার সাথে হুবহু মিলে গিয়ে বিজ্ঞানীদের অবাক করে দিয়েছে।
নিচে এই রোমাঞ্চকর বৈজ্ঞানিক তথ্যটি আলোচনা করা হলো:
১. কুরআনের সেই বিস্ময়কর আয়াত
ফেরাউন তার মন্ত্রী হামানকে একটি বিশাল টাওয়ার বা অট্টালিকা তৈরির নির্দেশ দিচ্ছিল যাতে সে (নাউযুবিল্লাহ) আকাশের দিকে উঠে মূসা (আ.)-এর ইলাহকে দেখতে পায়। কুরআনে সেই নির্দেশের ভাষাটি ছিল এমন:
"ফেরাউন বলল, 'হে পরিষদবর্গ, আমি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ আছে বলে আমি জানি না। অতএব, হে হামান! তুমি আমার জন্য কাদা (মাটি) পুড়িয়ে (ইট/পাথর) তৈরি করো, তারপর আমার জন্য একটি সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করো, যাতে আমি মূসার ইলাহকে উঁকি দিয়ে দেখতে পারি'..." (সূরা আল-কাসাস: ৩৮)
মূল বিষয়: এখানে আল্লাহ ফেরাউনের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন যে, সে কাদা বা মাটিকে আগুনে পুড়িয়ে (Fire-hardened clay) বিশাল ইমারত বানাতে বলেছিল।
২. আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার (পোড়া মাটি ও কংক্রিট)
দীর্ঘদিন ধরে মানুষ ভেবেছে পিরামিডের পাথরগুলো পাহাড় থেকে কেটে আনা। কিন্তু ২০০৬ সালের দিকে ফরাসি বিজ্ঞানী প্রফেসর জোসেফ ডেভিডোভিটস (Professor Joseph Davidovits) এবং ড্রেক্সেল ইউনিভার্সিটির গবেষক দল এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন।
নরম কাদা ও তাপ: তারা ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পিরামিডের পাথর পরীক্ষা করে দেখেন যে, এগুলো প্রাকৃতিকভাবে তৈরি পাথর নয়। বরং এগুলো ছিল 'সিনথেটিক কংক্রিট'। অর্থাৎ নরম কাদা বা চুনাপাথরের মিশ্রণকে ছাঁচে ঢেলে উচ্চ তাপে পোড়ানো হয়েছিল, যা শুকিয়ে গেলে হুবহু প্রাকৃতিক পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়।
সহজ নির্মাণ: পাহাড় থেকে হাজার হাজার টন ওজনের পাথর কয়েকশ ফুট উঁচুতে তোলা সেই যুগে প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু যদি মাটি বা কাদার মিশ্রণ বালতিতে করে ওপরে নিয়ে ছাঁচে ঢেলে সেখানে পুড়িয়ে পাথর বানানো হয়, তবে সেটি অনেক সহজসাধ্য। কুরআন ঠিক এই "কাদা পোড়ানো" প্রযুক্তির কথাই বলেছে।
৩. হামান (Haman): কুরআনের এক ঐতিহাসিক সত্য
১৮২২ সালে মিশরের হায়ারোগ্লিফিক লিপি (Hieroglyphics) পাঠোদ্ধার করার আগে কেউ জানত না যে 'হামান' নামে কেউ মিশরে ছিল কি না। এমনকি অনেকে দাবি করত যে কুরআন ভুল বলেছে, কারণ হামান ছিল পারস্যের রাজা ক্ষয়েরক্ষসের মন্ত্রী।
আবিষ্কার: লিপির পাঠোদ্ধারের পর দেখা যায়, ফেরাউনের রাজদরবারে সত্যিই 'হামান' নামে এক ব্যক্তি ছিল, যার পদবী ছিল "পাথর কোয়ারি বা নির্মাণ কাজের প্রধান" (Chief of the stone-quarry workers)।
কুরআনের নির্ভুলতা: কুরআন কেবল হামানের নামই বলেনি, বরং তাকে নির্মাণ কাজের (মাটি পুড়িয়ে পাথর বানানো) সাথে সম্পৃক্ত করে হুবহু ঐতিহাসিক সত্যটি তুলে ধরেছে।
৪. পোড়া মাটির প্রযুক্তি বনাম পিরামিড
|
বৈশিষ্ট্য |
প্রচলিত ধারণা |
কুরআনিক ও বৈজ্ঞানিক সত্য |
|
উপাদান |
প্রাকৃতিক বিশাল পাথর। |
ভূ-পলিমারিক কংক্রিট (মাটি ও চুনাপাথরের মিশ্রণ)। |
|
পদ্ধতি |
পাথর কেটে টেনে আনা। |
কাদা পুড়িয়ে ছাঁচে ঢালাই করা (Heat-treated clay)। |
|
তত্ত্বাবধায়ক |
অজানা। |
হামান (নির্মাণ কাজের প্রধান)। |
উপসংহার:
যে রহস্য উদঘাটন করতে আধুনিক বিজ্ঞানীদের মাইক্রোস্কোপ ও রাসায়নিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন হয়েছে, সেই তথ্য মরুভূমির বুকে অবতীর্ণ হওয়া একটি কিতাবে ১৪০০ বছর আগে কীভাবে এলো? এটিই প্রমাণ করে যে কুরআন কোনো মানুষের রচনা নয়, বরং এটি সেই মহান সত্তার বাণী যিনি অতীত ও ভবিষ্যতের সব খবর রাখেন।
আল-কুরআন সম্পর্কে একটি বিস্তারিত এবং তথ্যবহুল বাংলা নোট নিচে দেওয়া হলো:
আল-কুরআন: এক সংক্ষিপ্ত পরিচয়
আল-কুরআন হলো মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব। এটি মানবজাতির হেদায়েত বা পথপ্রদর্শনের জন্য শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দীর্ঘ ২৩ বছরে জিবরাঈল (আ.)-এর মাধ্যমে নাজিল হয়েছে।
১. গঠনগত বৈশিষ্ট্য
কুরআনের গঠনশৈলী অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং অলৌকিক। এর প্রধান বিভাজনগুলো হলো:
পারা: পবিত্র কুরআন মোট ৩০টি পারায় (ভাগে) বিভক্ত।
সূরা: এতে মোট ১১৪টি সূরা রয়েছে।
আয়াত: কুরআনে মোট ৬,৬৬৬টি (মতভেদে কিছুটা কম-বেশি) আয়াত রয়েছে।
মক্কী ও মাদানী: হিজরতের আগে নাজিল হওয়া সূরাগুলোকে 'মক্কী' এবং হিজরতের পরে নাজিল হওয়া সূরাগুলোকে 'মাদানী' বলা হয়।
২. মূল বিষয়বস্তু
কুরআন কেবল পরকাল নয়, বরং ইহকাল ও পরকাল উভয় জগতের দিকনির্দেশনা দেয়। এর প্রধান আলোচ্য বিষয়গুলো হলো:
তাওহীদ: আল্লাহর একত্ববাদ এবং তাঁর অসীম ক্ষমতার বর্ণনা।
রিসালাত: পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের কাহিনী এবং তাঁদের দাওয়াতের ইতিহাস।
আখিরাত: মৃত্যু-পরবর্তী জীবন, হাশর, জান্নাত ও জাহান্নামের বর্ণনা।
আইন-বিধান: পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা।
৩. অলৌকিকত্ব ও সংরক্ষণ
আল-কুরআনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অপরিবর্তনীয়তা। আল্লাহ নিজেই এর সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন:
"নিশ্চয় আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।" (সূরা আল-হিজর: ৯)
এটি পৃথিবীর একমাত্র গ্রন্থ যা কোটি কোটি মানুষ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অবিকল মুখস্থ (হিফজ) করে রেখেছেন। গত ১৪০০ বছরে এর একটি হরফও পরিবর্তিত হয়নি।
৪. কুরআনের কিছু বিশেষ তথ্য (একনজরে)
|
বিষয় |
বিবরণ |
|
ভাষা |
বিশুদ্ধ আরবি ভাষা। |
|
প্রথম সূরা |
সূরা আল-ফাতিহা। |
|
শেষ সূরা |
সূরা আন-নাস। |
|
দীর্ঘতম সূরা |
সূরা আল-বাকারাহ। |
|
ক্ষুদ্রতম সূরা |
সূরা আল-কাওসার। |
|
প্রথম অবতীর্ণ বাণী |
সূরা আলাক-এর প্রথম ৫টি আয়াত। |
৫. বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য
আধুনিক বিজ্ঞানের অনেক বড় বড় আবিষ্কার (যেমন: মহাবিশ্বের সৃষ্টি বা বিগ ব্যাং, ভ্রূণতত্ত্ব, সমুদ্রতত্ত্ব) সম্পর্কে কুরআনে ১৪০০ বছর আগেই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে কুরআন কোনো মানুষের রচনা নয়, বরং মহাবিশ্বের স্রষ্টার বাণী।
সারকথা: আল-কুরআন কেবল পড়ার জন্য নয়, বরং এটি বুঝে নিজের জীবনে প্রয়োগ করার জন্য। এটি মানুষের অন্তরের প্রশান্তি এবং সফলতার চাবিকাঠি।পড়ার জন্য ধন্যবাদ লেখা কে কপি পেস্ট না করে শেয়ার করুন ।। 🙏 লেখক আব্দুল মুসরেফ খাঁন। পাঁশকুড়া। পুর্বমেদিনীপুর।।

0 Reviews